রাধানাথ শিকদার – ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ এর আবিষ্কারক হয়েও যিনি উপেক্ষিত

রাধানাথ শিকদার
‘মাউন্ট এভারেস্ট’ এর আবিষ্কারক হয়েও যিনি উপেক্ষিত।

“স্যার, আমি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আবিষ্কার করেছি” আনন্দে উৎফুল্লে কথাটি বলছিলেন ভারতীয় বাঙ্গালি গণিতবিদ রাধানাথ শিকদার। রাধানাথ শিকদারকে সবাই স্মরণ করবেন একজন ভারতীয় গণিতবিদ হিসেবে। যিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিমালয়ের ১৫ নম্বর শৃঙ্গের (যার পরবর্তীকালে নাম হয় মাউন্ট এভারেস্ট) উচ্চতা পরিমাপ করেছিলেন। অথচ তিনি কখনোই মাউন্ট এভারেস্টে উঠেন নি।  সেই ১৮৫০-এর দশকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই তিনি এ শৃঙ্গের পরিমাপ করে উচ্চতা নিশ্চিত করেছিলেন। তাহলে রাধানাথ সিকদার কি করে কিভাবে আবিষ্কার করলেন এই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ? বলছি রাধানাথ সিকদারের আবিষ্কারের গল্প ও তার গাণিতিক জীবনের গল্প।

রাধানাথ শিকদার ১৮১৩ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতার জোড়াসাঁকোর শিকদার পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তিতুরাম শিকদারের বড় ছেলে। রাধানাথের বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবন তার ব্যাক্তিগত ডায়েরীতে যথেষ্ট পরিমান জানা যায়। রাধানাথ শিকদার দশ বছর বয়সে কলকাতার হিন্দু কলেজ তথা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। বাল্যকাল থেকে তিনি পড়াশোনার প্রতি অধিক মনযোগী ছিলেন। যদিও শিকদার পরিবারে এর পূর্বে পড়া লেখার খুব একটা প্রচলন ছিলো না। রাধানাথ হিন্দু কলেজে পড়েন সাত বছর দশ মাস। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের শেষ তিন বছর তিনি অধ্যাপক ডি. রস এবং অধ্যাপক জন টাইটলারের কাছে অধ্যয়ন করেন। রাধানাথের গণিতের প্রতি আগ্রহ ও তার মেধার প্রখরতার দেখে অধ্যাপক টাইটলার তাকে ভারতীয় জরিপ বিভাগে চাকরি জন্য সুপারিশ করেন। ফলে ১৮৩১-এর ১৯শে ডিসেম্বর ভারতীয় জরিপ বিভাগ ‘গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে’তে যোগদান করেন। জর্জ এভারেস্ট তখন ভারতীয় ত্রিকোণমিতিক জরিপ বিভাগে সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তি। এভারেস্ট সে যুগের একজন বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক। সেখান থেকেই তার পথচলা শুরু।

১৮৩০ এ জর্জ এভারেস্ট ভারতের সারভেয়র জেনারেল (Surveyor General) হিসেবে পদোন্নতি পান এবং তার অধীনেই রাধানাথ কাজ করত শুরু করেন নতুন উদ্যোমে। জরিপ বিভাগে কাজ করার সময়ে বিভাগীয় কর্তা জর্জ এভারেস্টের কাছে রাধানাথ উচ্চতর গণিত বিষয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পান। গণিতে তাঁর বুত্পত্তি দেখে এভারেস্ট বিস্মিত হন। তাঁর ইচ্ছে ছিল রাধানাথ বরাবর জরিপ বিভাগের কাজেই যুক্ত থাকুক। কৃতি ছাত্র হিসেবে রাধানাথের কর্মান্তরে যাওয়ার সুযোগ ছিল। রাধানাথ জরিপের কাজ শুরু করেন ১৮৩১ সালে ব্যারাকপুর প্রাঙ্ক (বিটি) রোডের দুই প্রান্তে দু’টি টাওয়ারের মধ্যে বেজলাইন পরিমাপের মাধ্যমে। দু’জন নিবেদিত প্রাণ ইংরেজ সার্ভে কর্মকর্তা অ্যান্ডু ওয়া এবং রেনি টেইলরের সহযোগিতায় রাধানাথ ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডে আরো কিছু সার্ভের কাজ করেন। থিওডোলাইট পেরামবুলেটরের মতো যন্ত্রের সাহায্যে তিনি আগ্রা, চুনার, অমরকন্টক, গোয়ালিয়র ও মুসৌরিতে ভূমি জরিপের কাজ করেন। রাধানাথ জরিপের কাজে হিমালয় ঘুরে শেষ পর্যন্ত কলকাতার কেন্দ্রিয় অফিসে এসে বসেন ১৮৫১ সালে। ক্রমে কেন্দ্রিয় অফিসে চীফ কম্পিউটার পদে উন্নীত হন। এখানে তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যবেক্ষকদের লক্ষ্য করা পর্বত শিখরের ফলাফল গণনার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হিমালয় পর্বতমালার গিরিশৃঙ্গগুলোর সমীক্ষা এক দুঃসাহসিক ও বিপজ্জনক কাজ। জীবনের ঝুঁকি সেখানে সাংঘাতিক। এই স্মরণীয় কাজ শুরু হয় ১৮৪৫ সালে এবং শেষ হয় ১৮৫০ সালে।

রাধানাথের সাথে আরো সাতটি বাঙ্গালি গণিতবিদ থাকলেও তারা ঝরে পড়ে। রাধারাথ একমাত্র বাঙ্গালি হিসেবে এভারেস্টের সাথে কাজ শুরু করেন। গণিতে তার দক্ষতার জন্য জর্জ এভারেস্টের অত্যন্ত প্রিয়ভাজনে পরিণত হন। রাধানাথের কাজ দাঁড়ায় ভোগলিক আকৃতি সমূহের পরিমাপের দিকে। রাধানাথ তার এ কাজ করার জন্য গণিতের প্রতিষ্ঠিত সূত্র বাদ নিয়ে তার নিজের মত করে নতুন সূত্র তৈরি করেন।একবার জর্জ এভারেস্ট রাধানাথের গণিতের প্রখরতায় মুগ্ধ হয়ে রাধানাথের পিতার নিকট একটি পত্র লেখেন। পত্রে রাধানাথের পিতা তিতুরামকে লিখেন- আমি যদি পারতাম তাহলে আপনার সাথে সাক্ষাতের জন্য দেহরাদুনে চলে আসতাম, আমি ব্যক্তিগত ভাবে আপনাকে প্রচন্ড সম্মান করি আপনার এমন একটি পুত্র সন্তান আমাদের উপহার দেয়ার জন্য। আমি জানি আপনিও তার জন্য নিজে গর্ববোধ করেন।

জর্জ এভারেস্ট ১৮৪৩ সালে চাকরী থেকে বের হয়ে পড়লে পরবর্তীতে রাধানাথকে প্রধান গণিতিবিদে পদোন্নিত করে তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়। কলকাতায় একইসাথে তিনি আবহওয়া বিদ্যাগত বিভাগের ও প্রধান হন। তিনি এবার পুরোদমে জরিপের কাজ শুরু করেন। রাধানাথ জরিপের কাজে হিমালয় ঘুরে শেষ পর্যন্ত কলকাতার কেন্দ্রিয় অফিসে এসে বসেন ১৮৫১ সালে। ক্রমে কেন্দ্রিয় অফিসে চীফ কম্পিউটার পদে উন্নীত হন। এখানে তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যবেক্ষকদের লক্ষ্য করা পর্বত শিখরের ফলাফল গণনার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।  ১৮৪৫-৫০ সালের মধ্যে হিমালয়ের ঊনাশিটি পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই পর্বতশৃঙ্গগুলোর মধ্যে ৩১টির স্থানীয় নাম জানা যায় এবং কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করে। অবশিষ্টগুলোকে ১, ২, ৩… হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অখ্যাত ভাবে এভারেস্টের সূচক সংখ্যা ছিল ১৫। ঐসব পর্যবেক্ষণের ফলাফল গণনাকালে রাধানাথ লক্ষ্য করেন হিমালয়ের ১৫ সংখ্যক শৃঙ্গের উচ্চতা পৃথিবীর যেকোনো শৃঙ্গ থেকে বেশি। বিখ্যাত বৃটিশ ভূগোলবিদ ক্যানিথ মেসন তার এক বক্তৃতায় বলেন-  সে সময় ছিলো যখন উচ্চতা মাপার জন্য বর্তমানের মত আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিলো না। রাধানাথ তার হিসাব নিকাশের পর এক সকালে স্যার এন্ড্রু ওয়াফের রুমে এসে তাকে বলেন- “স্যার, আমি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আবিষ্কার করেছি”  তখন এন্ড্রুকে তার গণনার ফলাফল দেখালে এন্ডু তার গণনার ফলাফল দেখে বিশ্মিত হন।

সর্বোচ্চ শৃঙ্গ তো নির্দিষ্ট হল, কিন্তু নামকরণ কি হবে? জর্জ এভারেস্ট একটি নিয়ম করেছিলেন যে নতুন কোন শৃঙ্গ তার স্থানীয় নামেই পরিচিত হবে, এভাবেই হয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, নন্দাদেবী ইত্যাদি নাম। কিন্তু ১৫ নং শৃঙ্গটির একটি অসুবিধা হল এটি নেপাল ও তিব্বতের মাঝে অবস্থিত। এই দুই দেশে শৃঙ্গটির আলাদা আলাদা নাম রয়েছে, কোন একটি জায়গার নাম বেছে নিলে অন্য দেশ ক্ষুব্ধ হতে পারে। পরে তাকে এভারেস্টের নাম প্রস্তাব করেন তার এই উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য। তখন তিনি হিমালয়ের ১৫ নম্বর এই শৃঙ্গের নাম রাখেন ‘মাউন্ট এভারেস্ট’। প্রস্তাবটি গৃহীত হল এবং সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম হয়ে গেল মাউন্ট এভারেস্ট। শৃঙ্গটির উচ্চতা নির্ণয়ে এভারেস্টের কোন ভূমিকাই ছিল না অথচ তার নামেই নামকরণ হ’ল , রাধানাথ উপেক্ষিতই রয়ে গেলেন। অথচ এই বিখ্যাত গণিতবিদ মাউন্ট এভারেস্টে না উঠেই ১৯৫২ সালে ঘোষনা দেন কাঞ্চনজঙ্গা নয় বরন হিমালয়ের ১৫ নম্বর চূড়াই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত। পূর্বে কাঞ্চনজঙ্গাকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে ধরা হতো।

মার্চ ১৮৫৬ সালে অফিসিয়ালি রাধানাথের গবেষণা পত্র প্রকাশ করা হয়। সেখানে রাধানাথ প্রথমদিকে এভারেস্টের চূড়া ২৯০০০ ফুট বললেও স্যার এন্ড্রু ওয়াফের সাহায্যে তা পুণরায় সংশোধন করে ২৯০২৯ ফুট (৮৮৪৮মিটার) বলে উল্লেখ করেন। প্রযুক্তির উন্নতির পরে প্রমাণিত হয় রাধানাথের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আবিষ্কার। বর্তমানে হাজার হাজার পর্বতারোহী পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট জয় করছে। বৃটিশ ঐতিহাসিক ‘জন কেই- তার এক প্রবন্ধে রাধানাথ শিকদারের গণিতে অবদান নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন। গণিতে তার অবদানের পাশাপাশি মাউন্ট এভারেস্ট আবিষ্কারের জন্য ইতিহাসে তার অবস্থান তুলে ধরেন।

১৯৮০ সালের মে মাসে রাধানাথ শিকদার মৃত্যু বরণ করেন, ততদিনে এভারেস্ট আবিষ্কারে তার যে নাম কিছুটাও ছিলো তাও তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করেছে। এটা আমদের দূর্ভাগ্য যে আমাদের এমন একজন মহান গণিতিবীদ থাকা সত্ত্বেও তিনি তার বাঙ্গালীর কাছেই অবহেলিত। অথচ তিনি না হলে হিমালয়ের ১৫ নম্বর চূড়া শুধুমাত্র একটি চূড়া হয়েই থাকতো। কিন্তু এসব কে মনে রাখে? সর্বোচ্চ শৃঙ্গটির নামকরণের সময়ে রাধানাথ উপেক্ষিত রইলেন কেন ? এভারেস্টের সঙ্গেও তো তার নামটি যুক্ত করা যেত। এটাই হল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের মানসিকতা। সেই মানসিকতা থেকে আজো রাধানাথ সরকার উপেক্ষিত, অবহেলিত।

  • তথ্যসূত্রঃ https://www.thebetterindia.com/165143/bengal-everest-radhanath-sikdar-india-history-news/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top