হেলেন কেলার – শারীরিক অক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে সক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রমাণ দিয়েছেন যিনি

হেলেন কেলার

শারীরিক অক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে সক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রমাণ দিয়েছেন যিনি

“আমার দৃষ্টিদ্বয়  তারা সরিয়ে নিল।
যেখানে যা হওয়া উচিৎ ছিলো,
কিন্তু আমি স্মরণ করি মিল্টনের স্বর্গখনি,
আমার শ্রবণদ্বয় তারা সরিয়ে নিলো।
যেখানে যা হওয়া উচিৎ ছিলো,
ভিথোভেন এসে মুছালো আমার চোখের পানি।
আমার জি্বহা তারা সরিয়ে নিলো।
যেখানে যা হওয়া উচিৎ ছিলো,

যখন আমি ছোট ছিলাম,
ঈশ্বরের সাথে কতো কথা
সম্পুর্ণ পোষন করি,
তিনি তাদের অনুমিত দেবেন না
সরিয়া নিতে আমার আত্মা।

এই আবেগময় অসাধারণ কবিতাটি যিনি লিখেছেন তিনি কানে শুনতে পায়নি কোনো দিন। চোখে দেখতে পায়নি কোনোদিন।    নিজের লিখা কবিতা কোনো দিন নিজের মুখে আবৃত্তি করতে পারেন নি। তিনি আর কেউ নয়, তিনি হেলেন কেলার।   নিজের জীবনকে মহীয়ান করে তোলা এক জীবনযোদ্ধার নাম হেলেন কেলার।  তিনি একাধারে, বাক শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছিলেন।

হেলেন কেলার ১৮৮০ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আর্থার কেলার এবং মায়ের নাম কেইট অ্যাডামস।  ছোট বেলা থেকেই তিনি ছিলেন খুব চটপটে। আর ৫-১০টা শিশুর মতো এক বছর বয়সেই তিনি হাটতে শুরু করেন। আর আধো আধো কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু   মাত্র ১৯ মাস বয়সেই হেলেনের জীবনে নেমে আসে ভয়ানক অন্ধকার। ধীরে ধীরে হেলেন তার কথা বলা, কানে শোনা ও ছোখে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে থাকেন। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মা-বাবা প্রাণপ্রিয় কন্যার জীবনের আশা-ভরসা ছেড়ে দিলেও একেবারে ভেঙে পড়েননি। হেলেনের চিকিৎসা করা শুরু করেন। বহু চিকিৎসার পর হেলেনের জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু তার কথা বলা, শোনা এবং দেখার শক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। হেলেনের এই অবস্থায় এক্কেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলেন তার পিতামাতা। একদিক সকাল বেলায় পত্রিকার পাতা উল্টাতে গিয়ে তাদের নজরে পড়ে এক আশার বানী। তারা দেখতে পায় ইংল্যান্ডের উপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের একটি লেখা। সেখানে খুব সুন্দর করে বর্ণনা করা আছে,  কিভাবে ডাক্তার স্যামুয়েল গ্রিডলি হাউই একটি অন্ধ বধির মহিলাকে শিক্ষিত করে তুলেছেন।

এই লেখাটা কেলার দম্পতী কে সাহস যোগায়। তারা সাথে সাথেই ওই ডাক্তারের খোজ নেন। কিন্তু পরে জানা যায়, ওই ডাক্তার আরো ১০ বছর আগেই মারা গিয়েছেন।  হেলেনের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখন মা-বাবা তাকে ওয়াশিংটনের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে পরামর্শের জন্য নিয়ে যান। গ্রাহাম বেল হেলেন কেলারকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, মেয়েটি আর কোনোদিন চোখে দেখতে পাবে না এবং কানেও শুনতে পাবে না। তবে গ্রাহাম বেল হেলেন কেলারের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা অনুধাবন করে বলেন- “পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন ফিরে পেতে পারে মেয়েটি”।

হেলেনের আট বছর বয়সে অ্যানি সুলিভান নামের এক গৃহশিক্ষিকা পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। অ্যানি নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন। অ্যানি প্রথমে আঙুল দিয়ে হেলেনের হাতে বিভিন্ন চিহ্ন এঁকে এবং এরপর বর্ণমালা কার্ড দিয়ে বর্ণমালা শেখান। তারপর ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করান। ১০ বছর বয়সে নরওয়েতে উদ্ভাবিত এক পদ্ধতি অনুসরণ করে কথা বলা শেখেন হেলেন। ১৯০০ সালে হেলেন রেডক্লিফ কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বিশ্বখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ১৯০৪ সালে হেলেন প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে স্নাতক  ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক ডিগ্রী নেয়ার আগেই তার আত্মজীবনী দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ প্রকাশিত হয়।

সমাজসেবক হেলেনঃ

শিক্ষা লাভের পর হেলেনের মনে প্রতিবন্ধীদের জন্য একরকম চিন্তার উদ্ভব হয়। সমাজে তার মতো আরও যারা বাক, শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রয়েছেন তাদের জন্য কিছু করার মানসিকতা তার মধ্যে গড়ে উঠে তার মনে। তিনি এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও গণমানুষের সহায়তা অর্জনে সচেষ্ট হন। এতে ব্যাপক সাফল্যও পান। তার জীবদ্দশায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, মার্ক টোয়েন, চার্লি চ্যাপলিনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের সহায়তা পেয়েছেন। হেলেন ১৯১৫ সালে জর্জ কেসলারকে সঙ্গে নিয়ে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটি এখনও বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন কেলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী শোনাতেন। এর জন্য ১৯৫৯ সালে হেলেন কেলার জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন।

 সঙ্গীত অনুরাগী  হেলেনঃ

তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী ছিলেন অথচ স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি সঙ্গীত উপভোগ করতে পারতেন। তার সঙ্গীত উপভোগ করার আশ্চর্য পদ্ধতি ছিল। তিনি বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই বলে দিতে পারতেন তাতে কী ধরনের সুর বাজছে। আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তায় হাতের স্পর্শ দিয়ে তিনি শ্রবণের কাজ করতেন। গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে হাত দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতেন কী সঙ্গীত গাইছেন তারা। তার এমন আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে, বহুদিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গে করমর্দন করে বলে দিতে পারতেন তার পরিচয়।

হেলেনের আরও যতো গুণঃ

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও তিনি নৌকা চালাতে পারতেন খুব ভালো। নদীতে সাঁতার কাটতে পারতেন। দাবা ও তাস খেলতে পারতেন। ঘরে বসে নকশিকাঁথা সেলাই করতে পারতেন। নিজের নৌকা চালনা নিয়ে তিনি বলেছেন-

“আমি খুব একটা নিশানা ঠিক রাখতে পারি না। সচরাচর অন্য কেউ পুরো নৌকা  চালানোর ব্যাপারটা সামলায় আর আমি দাঁড় ফেলি। সব সময় আমি হাল ছাড়াই যাই নৌকা বাইতে। তখন জলডোবা ঘাস, শাপলা আর পাড়ের ঝোপঝাড়ের গন্ধে দিক ঠিক করতে হয়। দারুণ মজার ব্যাপার! আমার দাঁড়গুলোয় চামড়ার ব্যান্ড লাগানো আছে। এ কারণে পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে না। বৈঠা ঠেলতে কতটা জোর লাগছে তার ওপর নির্ভর করে আমি বুঝতে পারি দাঁড় ঠিকমতো পড়ছে কি না। একইভাবে স্রোতের বিপরীতে কখন চলেছি তাও টের পাই। বাতাস আর ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে আমার ভালো লাগে।”

রাজনীতিতে হেলেনঃ

হেলেন রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও লেখালেখি করেছেন। তিনি ছিলেন আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টির সমর্থক। এ পার্টিতে যোগ দেন ১৯০৯ সালে। তিনি আয়ের সুষম বণ্টন দেখতে চাইতেন। ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অসমতার শেষ দেখাই ছিল তার ইচ্ছা। তার বই ‘আউট অব দ্য ডার্ক’তে এ ইচ্ছার কথা লিখে গেছেন তিনি। প্রতিটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ইউজিন ভি ডেবসের সমর্থন পেয়েছিলেন। ১৯১২ সালে তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ডে যোগ দেন। তিনি ছিলেন একজন প্যাসিফিস্ট এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িত থাকার ঘোর বিরোধী।

চলচ্চিত্রে হেলেন কেলারঃ

বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জীবনের বিড়ম্বনা ও দুঃখ-দুর্দশাকে উপজীব্য করে নির্মিত ডেলিভারেন্স চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন হেলেন কেলার। ট্রেভলিন মিলার রচিত এ নির্বাক ছবি পরিচালনা করেন জর্জ ফস্টার প্ল্যাট। এ ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি নিজেই।

১৯৬৮ সালের ১ জুলাই হেলেন কিলার চলে যান পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। তার স্মৃতি অম্লান করে রাখার জন্য আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত হয় হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল। বেশ কয়েকটি বই ও লিখেছেন তিনি। সেখানে আছে বিখ্যাত কিছু উক্তি ও। হেলেন কেলারের কয়েকটি উক্তি তুলে ধরছি –

  • এক শব্দে বলা যায়, সাহিত্য আমার ইউটোপিয়া। শুধু এখানেই আমি অধিকারবঞ্চিত নই। আমার বইবন্ধুদের সঙ্গে মিষ্টি, সাবলীল আলাপে ইন্দ্রিয়ের কোনো বাধাই দেয়াল তুলে দাঁড়ায় না। তারা আমার সঙ্গে নির্দ্বিধায়, অসংকোচে কথা বলে। যা কিছু আমি শিখেছি এবং যা কিছু শেখানো হয়েছে আমাকে, ওদের ‘বিশাল ভালোবাসা আর স্বর্গীয় বদান্যতা’র পাশে হাস্যকর রকমের মামুলি বলে মনে হয়।
  • শিক্ষার চূড়ান্ত ফল হচ্ছে সহনশীলতা।
  • অন্ধকারে একজন বন্ধুর সঙ্গে হাঁটা আলোতে একা হাঁটার চেয়ে ভালো।
  • যেমন করে একটা গাছের শেকড় মাটির নিচের অন্ধকারে থেকেও টের পায় তার ওপরের অংশের আনন্দ, রোদ আর হাওয়া আর পাখির পরশ- প্রকৃতির অনুগ্রহে আমিও তেমনই দেখেছি অনেক অদেখাকে।
  • আমার মনে হয় আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এমন একটা ক্ষমতা আছে, যার বলে সৃষ্টির আদি থেকে যা কিছু অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার ছাপ পড়েছে মানুষের মনে- তার একটা ধারণা আমরা করতে পারি।
  • প্রত্যেক মানুষেরই মনের অতলে রয়ে গেছে সবুজ মাটি আর টলমলে পানির স্মৃতি। অন্ধত্ব কিংবা বধিরতা আমাদের পূর্বপুরুষের দেয়া এ অধিকার লুট করে নিতে পারে না। উত্তরাধিকার সূত্রে লব্ধ এ ক্ষমতা অনেকটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মতো- আত্মার ইন্দ্রিয়, যা একই সঙ্গে দেখে, শোনে এবং অনুভব করে।
  • একা আমি কিছু একটা করতে পারি, আর আমরা অনেকে অনেক কিছু করতে পারি।
  • পৃথিবীর সেরা সুন্দর জিনিসটি হয়তো আমরা ধরতে পারি না, ছুঁতেও পারি না- কিন্তু হৃদয় দিয়ে ঠিকই অনুভব করতে পারি।
  • তোমার মাথাকে কখনও নত হতে দিও না, সবসময় উঁচু করে রাখ চোখ বরাবর।
  • জীবন হচ্ছে একটা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ- নয়তো কিছুই নয়।

যেখানে প্রতিবন্ধী একজন মানুষ সমাজের পরিবারের সর্বোপরি দেশের বোঝা মনে করে নিজেকে সেখানে হেলেন কেলার এক ইতিহাস রেখে গিয়েছেন আমাদের জন্যে। তার সাধনা, তার অভিপ্রায় শুধু মাত্র প্রতিবন্ধী নয় পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষের জন্যে আদর্শ হয়ে থাকবে। তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, শারীরিক অক্ষমতা কোনো সমস্যাই না যদি কেউ মন থেকে,  ভেতর থেকে সক্ষম হয়।  প্রত্যেক সফলতার পেছনে থাকে কেবল ইচ্ছাশক্তি।  হেলেন কেলার দেখিয়ে দিয়েছেন, চাইলেই সব সম্ভব,  হোক না সে প্রতিবন্ধী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top