সিসিলি পার্ল উইদারিংটন – মেকি বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া অন্যতম সাহসী নারী গোয়েন্দা

সিসিলি পার্ল উইদারিংটন
মেকি বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া অন্যতম সাহসী নারী গোয়েন্দা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মিত্র বাহিনীর পক্ষে বৃটিশ নারী গোয়েন্দাদের অবদান ছিলো অনস্বীকার্য। জার্মানিতে তখন নারী গোয়েন্দারা বিভিন্ন কর্মচারী সেজে খুব সহজে গেস্টাপো বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে পারতো।  বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা (SEO) গঠনের পর যেসকল নারী সেখানে যোগ দেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন সিসিলি পার্ল উইদারিংটন। বিশ্বযুদ্ধে তার সাহসী কর্মকান্ডের জন্য পরবর্তীতে তিনি পুরষ্কৃত হন।

সিসিলি পার্ল উইদারিংটন জাতিতে ব্রিটিশ, কিন্তু জন্ম ফ্রান্সে হওয়ায় ফরাসি ভাষা বলতে পারতেন ফ্র্যাঞ্চদের মতোই। উইদারিংটন ফ্রান্সে থাকার সময় ফ্রান্সের বৃটিশ এম্বাসিতে কাজ করতেন। তার পিতা ইংল্যান্ডের সনামধন্য ব্যাবসায়ি ছিলো, সিসিলি বৃটিশ এম্বাসিতে কাজ করার সময় সব কিছু ঠিকঠাক ছিলো। বিপত্তি শুরু হয় জার্মান নাৎসী বাহিনী যখন ফ্রান্স দখল করতে আসে।

নাৎসিরা ফ্রান্স দখল করলে সিসিলি তার মা ও তিন বোনকে নিয়ে ১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাসে পালিয়ে লন্ডন চলে আসেন। লন্ডনে পৌঁছে তিনি বৃটিশ এয়ার মিনিস্ট্রিতে কাজ শুরু করেন। তখনো পর্যন্ত তিনি গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করার কথা ভাবতে পারেননি। এদিকে দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, অন্যদিকে এয়ার ফোর্সে কাজ করতে করতে তিনি নিজে নিজে বৃটিশ বিমান বাহিনীর আরো সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী হন।  তারপরেই ১৯৪৩ সালের জুনের ৮ তারিখে এসওই-তে যোগ দেন।  ১৫ সপ্তাহ ট্রেনিংয়ের পর তাকে পুনরায় ফ্রান্সে পাঠানো হয়। তিনি কাজ করবেন কুরিয়ার হিসেবে, কসমেটিক্স সামগ্রী বিক্রেতা হিসেবে এবং অস্ত্রপাচার ও গোয়েন্দাগিরিতে। ফ্রান্সে এসেই তিনি ‘মেরি’ ছদ্মনাম ধারণ করেন।

সিসিলি ফ্রান্সে আসেন ১৯৪৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বরে। মরিস সাউথগেটের নেতৃত্বের অধীনে কাজ শুরু করেন মেরি। পরবর্তী ৮ মাস সাউথগেটের অধীনেই সিসিলি কসমেটিক্স বিক্রেতা ও গোয়েন্দা তথ্য কুরিয়ার ম্যান হিসেবে পাচারের কাজ করেন।

এ সময় ১৯৪৪ সালের মে মাসে রেস্টলার রেসিসট্যান্স মুভমেন্টের নেতা মরিস সাউথগেট গেস্টাপো বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে দলের এরকম সংকট মুহূর্তে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন সিসিলি। এ দলে ছিল দেড় হাজারেরও বেশি যোদ্ধা। সিসিলির নেতৃত্বে এ দলটির হাতে আনুমানিক এক হাজার জার্মান সৈন্য নিহত হয়। এ ছাড়া ফ্রান্সের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলীয় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় ৮০০ বারেরও বেশি বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম হয় তারা। তখন সিসিলি নিজের ছদ্মনাম আরেকবার পরিবর্তন করে রাখেন ‘পউলিন’।

ডি-ডে তে সিসিলির বাহিনী মিত্র বাহিনীর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এরপর থেকে সিসিলির বাহিনী গেস্টাপোর নজরদারিতে চলে আসে।   জার্মানরা তাকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা সিসিলির মাথার মূল্য ধার্য করে ১০ লাখ ফ্রাঁ। একপর্যায়ে সিসিলি ও তার যোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালায় দুই হাজার জার্মান সৈন্যের একটি দল। ১৪ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। এতে ৮৬ জন জার্মান সেনা এবং ২৪ জন প্রতিরোধ যোদ্ধা নিহত হয়। কিন্তু জার্মানরা সেবারও সিসিলির নাগাল পায়নি।

সেই দিনের দীর্ঘ ১৪ ঘন্টা যুদ্ধে সিসিলি পরাজিত না হলেও তার গোয়েন্দা দল একটু ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। সিসিলি এরপর আরেকটি গেরিলা দল প্রতিষ্ঠা করে তার নেতৃত্ব দেন। সেই গোয়েন্দা দল আবারো যুদ্ধে মিত্র বাহিনীর পক্ষে সাহসী ভুমিকা রাখতে শুরু করে। হাজারের উপর জার্মান সৈন্যকে হত্যা করতে সক্ষম হন সিসিলি। এছাড়া মিত্র বাহিনীর পক্ষে যতবার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন পড়ে সিসিলি ততবারই সফলতার সাথে তা করতে সক্ষম হন। সিসিলি মেকি বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া নারী গোয়েন্দা সদস্যদের একজন। খুব কম সংখ্যক নারীই এ বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলো।

জার্মান সৈন্যরা তাকে বারবার হত্যা চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়ে তার আর দেখাই পাচ্ছিলো না। সর্বশেষ  সিসিলিকে যখন জার্মান সৈন্যরা দেখেছিলো তখন জার্মান সৈন্যদের  লজ্জাজনক বিদায়বেলা। সেদিন হিটলারের ১৮ হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন সিসিলি।

যুদ্ধশেষে সিসিলিকে মিলিটারি মেডেল দেয়ার সুপারিশ করা হলেও তা গ্রাহ্য করা হয়নি। কারণ, কোনো নারীকে এই পদক দেয়া হয় না। অবশ্য পরে তিনি প্রথমে এমবিই এবং পরে সিবিই পান। ২০০৮ সালে ৯৩ বছর বয়সে ফ্রান্সে এ দুঃসাহসী নারীর মৃত্যু হয়।

  • https://en.wikipedia.org/wiki/Pearl_Witherington
  • https://nigelperrin.com/soe-pearl-witherington.htm

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top