লর্ড ক্লাইভের আত্মহত্যা

লর্ড ক্লাইভের আত্মহত্যা

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, ষড়যন্ত্রকারী ও সুচতুর সৈনিক রবার্ট ক্লাইভ ১৭২৫ সালে আয়ারল্যান্ডে এক মাঝারি জমিদার পরিবারে জন্নগ্রহণ করেন। স্কুলজীবনে ছাত্র হিসেবে ভালো ফলাফল করতে না পেরে ১৭৪৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে মাদ্রাজ চলে আসেন। মাদ্রাজে একবার ফরাসিদের হাতে বন্দী হন এবং বুদ্ধি খাটিয়ে বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ক্লাইভ ১৭৪৮ সালে কোম্পানির চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে মাদ্রাজ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সর্বনিম্ন কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। উচ্ছৃঙ্খল, উগ্র ও হটকারী ক্লাইভ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়ে দেবীকোট দুর্গ দখল করেন এবং আর্কট অভিযান পরিচালনা করেন। এই দুই অভিযানে তিনি প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেন। ১৭৫৩ সালে ক্লাইভ মাতৃভুমিতে প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানে ‘কোর্ট অব ডাইরেক্টস’ তাঁর বীরোচিত ভুমিকার জন্য তাঁকে ‘জেনারেল ক্লাইভ’ বলে অভিহিত করে রত্নখচিত তরবারি উপহার দেয়।

লন্ডনে বীরোচিত সংবর্ধনার পর তাঁর মনে হয় যে তিনি জননেতা হবেন। সে কারণে তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তফা দেন এবং পার্লামেন্টে আসন লাভের জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে অসংযত আচরণের জন্য তিনি ধন সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা হারান। অবশেষে হতাশাগ্রস্ত হয়ে তিনি ১৭৫৫ সালে আবার মাদ্রাজে ফিরে যান।

মাদ্রাজে এসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ক্লাইভ হায়দ্রাবাদের নিজামের বিরুদ্ধে অতর্কিতে আক্রমণ পরিচালনা করে বিজয়ী হন। ১৭৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি গেরিয়া দুর্গ অধিকার করেন এবং মারাঠাদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। ক্লাইভের দুরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও রণকৌশলের প্রশংসায় যখন মাদ্রাজের ইংরেজরা পঞ্চমুখ এবং উৎসবমুখর, তখন সংবাদ এল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নবাব সিরাজউদ্দৌলার হাতে কলকাতার পতন হয়েছে। বিতাড়িত ইংরেজরা ফলতায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এবং তারা জল খাদ্যের অভাবে মৃতপ্রায়।

মাদ্রাজের বিজয়ী ইংরেজরা কলকাতায় বিপদগ্রস্ত ইংরেজদের রক্ষায় সর্বাপেক্ষা যোগ্য বিবেচনা করে ক্লাইভকে। ১৭৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী নৌপথে মাদ্রাস থেকে যাত্রা শুরু করে এবং ডিসেম্বর মাসে ফলতায় পৌঁছে। ক্লাইভের সাহায্যকারী ছিলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। ক্লাইভ ও ওয়াটসনের যৌথ অভিযানের ফলে ১৭৫৭ সালের ২ জানুয়ারি কলকাতা পুনর্দখল করে ইংরেজরা এবং ৯ ফেব্রুয়ারি সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে অনুকুল শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে।

কলকাতা বিজয়ের পর ফোর্ট উইলিয়ামের সিলেক্ট কমিটির স্বঘোষিত গভর্নর হন রবার্ট ক্লাইভ। অগ্রজ ও যোগ্য রজার ড্রেক, রিচার্ড বেকার এবং অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে উপেক্ষা করে তিনি নিজেকে এ পদে অগণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত করেন। স্বনির্বাচিত পদে নিরাপদ থাকার জন্য বিরুদ্ধপক্ষকে সামরিক হুমকিও দেন তিনি। গভর্নর হিসেবে অবস্থান নিশ্চিত করে ক্লাইভ কলকাতা থেকে ফরাসিদের বিতাড়ন করার ও পলাশী যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। শত্রুভাবাপন্ন সিরাজউদ্দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করে, তাঁর পরিবর্তে একজন অনুগত ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে তৎপর হন ক্লাইভ। ১৭৫৭ সালের মার্চ মাসে চন্দননগরের ফরাসি উপনিবেশ অধিকার করেন তিনি। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাত করার জন্য ক্লাইভ জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদের সঙ্গে ১৯ মে ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তি করেন। সেই ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী পলাশীতে প্রহসনমূলক যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে নবাবের পরাজয় হয়। নবাব বন্দী হন এবং তাঁকে হত্যা করা হয়। আর চুক্তি অনুযায়ী মসনদে বসেন প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান।

রবার্ট ক্লাইভের ষড়যন্ত্রে বাংলা তার স্বাধীনতা হারাল। ক্লাইভ ইংরেজ জাতির কাছে সম্মানিত ও খ্যাতিমান হলেন। তবে ভারতীয়দের কাছে ঘৃণিত ও খল হিসেবেই চিহ্নিত হলেন। বাঙালির ইতিহাসে ক্লাইভ মন্দ ব্যাক্তি হয়েই থাকলেন। রবার্ট ক্লাইভ দক্ষিণ ভারতে ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হলেও সম্পদশালী হতে পারেননি। কিন্তু বাংলা বিজয়ের পর লুন্ঠিত ও প্রাপ্ত অংশের অর্থে তিনি বাংলার সব নবাব অপেক্ষা ধনী হয়ে যান। অবশেষে ১৭৬০ সালে অবসর গ্রহণের পর বিপুল অর্থবিত্তসহ ক্লাইভ লন্ডন চলে যান।

ব্রিটিশ বীর রবার্ট ক্লাইভ ‘ব্যরন ক্লাইভ অব পলাশী’, ‘নাইট অব দ্য বাথ’, ‘দিলার জং’, ‘সাইফ জং’, ‘মামিরুল মামালিক’, ‘সাবদাতুল মুলক’ ইত্যাদি উপাধি ও খেতাবে ভুষিত হন। এর বেশ কয়েক বছর পর বাংলায় কোম্পানি শাসন পরিচালনার অপরিহার্য প্রয়োজনে আবার ক্লাইভকে ডেকে আনা হয়। তিনি ১৭৬৫ সালে কলকাতায় আসেন। এবার তিনি ষড়যন্ত্র করে হুমকি দিয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দিওয়ানি লাভ করেন। তিনি রাজনৈতিক দুরদর্শিতার পরিচয় দেন। তিনি দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগ ছাড়া মুনাফা এবং দায়িত্ব ছাড়া রাজস্ব আদায় করে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেন। এই কৃতিত্বের কারণে ইংরেজদের জাতীয় বীরে পরিণত হন তিনি। তাঁর পূর্ণাবয়ব ও আবক্ষমূর্তি ইন্ডিয়া অফিস ও পার্লামেন্ট ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয়। তিনি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

কিন্তু রবার্ট ক্লাইভের কর্মক্ষেত্র বাংলায় তিনি বরাবরই ঘৃণিত থেকেছেন। জনগণ-মনে খল হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। একজন নিচ ও ষড়যন্ত্রকারী, শঠ ও প্রতারক হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। লর্ড ক্লাইভ ভারতবর্ষের দায়িত্ব পালন শেষে ফিরে যান লন্ডনে। সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় অবসর জীবনযাপন করেন। ওই নিঃসঙ্গ সময়ে বিগত জীবনের সমুদয় নিচুতা, অতীতের গ্লানি ও পাপ চিন্তায় তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। অবশ্য ক্লাইভের জীবনীকার ম্যালকম বলেন−ক্লাইভ শৈশব থেকেই বিষণ্নতাজাত মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তবে এ উপমহাদেশের লোকজন বিশ্বাস করত, ক্লাইভের পাপই তাঁকে অসুস্থ করে দেয় এবং পাপ চিন্তায় জর্জরিত ও অভিশপ্ত লর্ড রবার্ট ক্লাইভ ১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর স্বীয় গৃহে নিজ পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করেন।

ক্লাইভের মৃত্যুতে অনেক ইংরেজই বেদনার্ত হয়ে কেঁদেছে। তবে একজন ভারতবাসীও কাঁদেনি বরং গোপনে আনন্দ উল্লাস করেছে।

মূল লেখকঃ রতন সিদ্দিকী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top