মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্ট

মোহাম্মদ আলী দ্যা গ্রেটেস্ট

মোহাম্মদ আলী বক্সিং জগতের এক কিংবদন্তী। জাতে আফ্রিকান আর জাতিতে আমেরিকান। পূর্ব পুরুষেরা দাস হিসেবে এসেছিলেন আমেরিকায়। ১২ বছর বয়সে একটি ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু করেন বক্সিং। বলিষ্ঠ দেহ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর ক্ষিপ্রতায় ভর করে আলী পৌঁছেছিলেন খ্যাতির শীর্ষে। খ্রিস্টান হিসেবে জন্ম গ্রহন করলেও পরবর্তী জীবনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তৎকালীন আমেরিকা-ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় পড়েন ভোগান্তিতে হারাতে হয় উপাধি, বহিষ্কার হন চার বছরের জন্য।

তিনি ৩ বারের ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন এবং ওলিম্পিক লাইট-হেভিওয়েট স্বর্ণপদক বিজয়ী। ১৯৯৯ সালে মুহাম্মদ আলীর নাম বিবিসি এবং স্পোর্টস ইলাট্রেটেড স্পোর্টসম্যান অব দ্যা সেঞ্চুরি অথবা শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করে।

জন্ম পরিচয়

মোহাম্মদ আলী ১৭ই জানুয়ারি ১৯৪২ সালে আমেরিকার কেনটাকির লুইসভ্যালিতে জন্মগ্রহণ করেন। দুই ভাই এর মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। জাতে তারা ছিলেন আফ্রিকান। তার পূর্ব পুরুষরা এসেছিলেন মাদাগাছকার থেকে। তার পিতা ক্লে সিনিয়র সাইনবোর্ড এবং বিলবোর্ড রঙ করতেন এবং তার মা ওডিসা গ্র্যাডি ক্লে একজন গৃহিনী ছিলেন। যদিও ক্লে সিনিয়র একজন মেথডিস্ট ছিলেন কিন্তু তার সন্তানদের ব্যাপ্টিস্টে নিতে তার স্ত্রীকে অনুমতি দিতেন।

 এক নজরে মোহাম্মদ আলী

  • জন্মঃ ১৭ই জানুয়ারি ১৯৪২ সাল
  • নামঃ ক্যাসিয়াস ক্লে পরে ধর্ম বদলে হন মোহাম্মদ আলী
  • উপনামঃ পিপলস চ্যাম্পিয়ন
  • উচ্চতাঃ ৬ ফিট ৩ ইঞ্চ
  • জাতীয়তাঃ আমেরিকান
  • লড়েছেনঃ ৬১ বার
  • জিতেছেনঃ ৫৬ বার
  • নক আউটঃ ৩৭ বার (জিতেছেন)
  • হেরেছেনঃ ৫ বার

বক্সিং এ যোগদান

কৈশোরে একবার তার প্রিয় বাইসাইকেলটি হারানো যায়। সে পুলিশের(মার্টিন) কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলে সে চোরকে পেটাতে চায়। অফিসার(সে শহরের বক্সীং কোচ) তাকে বলে যে এর জন্য তাকে লড়াই করতে জানতে হবে। পরদিন তিনি মার্টিন এর কাছ থেকে বক্সিং শেখা শুরু করেন। তিনি তাকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে প্রজাপতির মত নেচে নেচে মৌমাছির মত হুল ফোটাতে হয়। ১৯৬০ সালে তিনি অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেন।

৬’৩’’ উচ্চতার আলীর বিশেষত্ব ছিল তিনি খেলার সময়ে সবার মত হাত মুখের সামনে রাখতেন না, শরীরের পাশে রাখতেন। প্রতিপক্ষের মার ঠেকানোর জন্য নির্ভর করতেন সহজাত প্রবৃত্তির উপর। ২৯-১০-১৯৬০ এ তিনি প্রথম পেশাদার লড়াই জেতেন। ১৯৬০-১৯৬৩ তিনি টানা ১৯টি লড়াই জেতেন যার মধ্যে ১৫টি নকআউট। ১৯৬৩ সালে তিনি ডগ জোন্স এর সাথে ১০ বাউটের এক বিতর্কিত লড়াই এ জেতেন।

মোহাম্মদ আলী ও সনি লিস্টনের প্রথম লড়াই

মোহাম্মদ আলী এবং সনিলিস্টনের সময় (ফেব্রুয়ারি ২৫, ১৯৬৪ সাল) সনি লিস্টন ছিলেন ঐ সময়ের হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। সনি হারিয়েছিলেন ফ্লয়েদ পেতারসনকে ১৯৬২ সালে।

এ সময় মোহাম্মদ আলীর পারফরমেন্স খুব একটা ভাল ছিল না। সানি ও আলীর অনুপাত ছিল ৭-১। এতদসত্বেও আলী সনিকে প্রস্তুতি পর্বে ভাল্লুক বলে ক্ষেপীয়ে ছিল। বলেছিল যে সনির গা থেকে ভাল্লুকের গন্ধ আসে, তাকে হারিয়ে চিড়িয়াখানায় রেখে আসবে। আরও বলেছিল যে সে প্রজাপতির মত উড়ে উড়ে, মৌমাছির মত হুল ফোটাবে। সে সানিকে উপেক্ষা করার কৌশল গ্রহন করেছিল এবং বলেছিল, “তোমার চোখ যা দেখতে পাবে তাকেই তোমার হাত আঘাত করতে পারবে না”। তার হৃদ স্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন ভয়ের কারণে আলীর এমনটা হচ্ছে। সে হয়তো ভাল খেলবে না।

শুরুর দিকে সনি বেশ দ্রুত আঘাত হানছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি রেগে ছিলেন এবং দ্রুত নক আউট চাচ্ছিলেন। কিন্তু আলীর ক্ষিপ্রতা তাকে ফাকি দিচ্ছিল। দ্বীতিয় রাউন্ডে সনি ভাল করেছেন। কিন্তু তৃতীয় রাউন্ডে আলী তার হাঁটু দুর্বল করে দেন এবং তার বা চোখের নিচে কেটে যায়। চতুর্থও রাউন্ডে আলীর চোখ ব্যথা শুরু হয়। কারণ জানান হয় সনির চোখের কাটার ক্রিম থেকে এই ব্যথার উৎপত্তি। পরে অভিযোগ ওঠে (প্রমাণিত নয়) পূর্বের দুই প্রতিযোগীও এমন সমস্যায় পরেছিলেন।

এর পরও আলী পঞ্চম রাউন্ড পর্যন্ত খেলে গেলেন। এ পর্যায়ে ঘাম এবং চোখের জল তার চোখ ধুয়ে দিয়েছিল। ষষ্ঠ রাউন্ডে আলী একের পর এক আঘাত হানতে থাকেন। সপ্তম রাউন্ডে সনি  বেল শুনতে পাননি। কতৃপক্ষ আলীকে বিজয়ী ঘোষণা করে। সনি তার হারের জন্য ঘাড়ের ব্যথাকে দায়ী করে। এ কথা শুনে আলী দৌড়ে রিং সাইডে গিয়ে চিৎকার করে বলেন, “তোমার কথা ফিরিয়ে নাও”। তারপর রিং এ এক সাক্ষাৎকারে আলী চিৎকার করে বলেছিল, “আমি বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছি। আমি প্রত্যেক দিন ঈশ্বরের সাথে কথা বলি। আমি অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ হবো”।

 বহিষ্কার এবং ফিরে আসা

 ১৯৬৪ সালে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগদানে ব্যর্থ হন। ১৯৬৬ সালে যোগ দেন কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন যে, কোরআন যুদ্ধ সমর্থন করে না। আল্লাহ বা নবীর নির্দেশ ছাড়া তিনি যুদ্ধে যাবেন না। কোন ভিয়েতনামির সাথে তার বিরোধ নেই, তারা কেউ তাকে কালো বলে গালিও দেয়নি। তিনি ক্যাসিয়াস ক্লে বলে পরিচিত হতে চাননি, এ কারণে তিনি ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় লড়াই এ অংশ নিতে পারেননি।

১৯৬৫ সালে লিস্টন এর সাথে ফিরতি ম্যাচের পর ১৯৬৭ সালে যারা ফলির সাথে ম্যাচের মধ্যে তিনি ৯ বার শিরোপা রক্ষার লড়াইয়ে নামেন। খুব কম বক্সারই এত কম সময়ে এত বেশি বার লড়াই করেন। তার জীবনের একটি অন্যতম কঠিন লড়াইয়ে তিনি ১২ রাউন্ডে জয় লাভ করেন। আলি ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় ফিরে এসে ক্লিভল্যান্ড উইলিয়াম এর সাথে লড়াই করেন। এটি তার সেরা ম্যাচগুলোর একটি যেটিতে তিনি ৩ রাউন্ডে জিতেন। ১৯৬৭ সালে তিনি হিউস্টন এর একটি রিং এ এরনি তেরেল এর সাথে লড়াই এ নামেন। তেরেল তাকে ম্যাচ এর আগে ক্লে বলে অপমান করেন। আলি তাকে সঠিক শাস্তি দেয়ার মনস্থির করেন। ১৫ রাউন্ডের এ লড়াইয়ে তিনি তাকে রক্তাক্ত করেন, অনেকে মনে করেন যে আলি ইচ্ছা করে লড়াই আগে শেষ করেননি। ১৯৬৭ সালে তিনি ৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন যুদ্ধে না যাওয়ার কারণে। ১৯৭০ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনি লড়াইয়ে ফিরে আসতে সমর্থ হন।

ইসলাম গ্রহন

১৯৭৫ সালে মোহাম্মদ আলী (ক্যাসিয়াস ক্লে) ইসলাম গ্রহন করেন। তার নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস এক্স, কারণ তিনি মনে করতেন তার পদবী দাসত্বের পরিচায়ক। এর কিছুদিন পর গোত্র প্রধান সাংবাদিকদের কাছে তাকে মোহাম্মদ আলী বলে পরিচয় করিয়ে দেন।

অবসর গ্রহণ

তিনি ১৯৮০ সালে ফিরে আসেন ল্যারি হোমস এর কাছ থেকে শিরোপা ছিনিয়ে নিতে। ল্যারি ছিলেন তার শিষ্য তাই সকলেই লড়াইটি নিয়ে আগ্রহী ছিল। ১১ রাউন্ড পর আলী পরাজিত হন। পরে জানা যায় মস্তিষ্কে মারাত্মক ত্রুটি ধরা পড়েছে। তার মস্তিষ্ক ফুটো হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি ১৯৮১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি “সর্বকালের সেরা” বক্সার।

শেষ কথা

১৯৮০ সালে তিনি পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হন। তাকে যখন বলা হয় তিনি তার রোগের জন্য বক্সিংকে দায়ী করেন কিনা, তিনি বলেন বক্সিং না করলে এত বিখ্যাত হতেন না। অবসরের পরে তিনি তার জীবনকে মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যান। ২০১৬ সালের ৩ জুন এ কিংবদন্তী মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top