ভারতের দামু ধত্রি – ভুলে যাওয়া বিখ্যাত সেই সার্কাস লিজেন্ড

ভারতের দামু ধত্রি

ভুলে যাওয়া বিখ্যাত সেই সার্কাস লিজেন্ড

১৯২৭ সাল। সাংহাইতে একটি সার্কাস শো হবার সময় একজন লেখক ঠিক করলেন যে, তিনি ঐ সার্কাসের একজন রিং মাস্টারের একটি সাক্ষাতকার নেবেন হিংস্র প্রাণিদের পাশে নিয়ে খাঁচার ভেতরেই। সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য এ ধরণের একটি স্থান নির্বাচন করা নিঃসন্দেহে একটি ঘটনা, যেখানে তখন পাঁচটি বাঘ এবং চারটি চিতাবাঘ উপস্থিত ছিল। তবে রিং মাস্টার দামু ধত্রির জন্য এটি ছিল একটি নৈমিত্তিক সাধারণ ঘটনা।

দামু ধত্রির বয়েস তখন ছিল মাত্র ২৫। কিন্তু ততদিনে তিনি সার্কাসের জগতে দুঃসাহসিক সার্কাস পারফর্মেন্সের জন্য একজন লিজেন্ড হয়ে গেছেন। ভারতে জন্মগ্রহনকারী দামু সার্কাসের জগতে এত বিখ্যাত হওয়া স্বত্ত্বেও ভারতেই এ বিখ্যাত ব্যাক্তি সম্পর্কে খুব লোকই জানেন।

তার পৌত্র মহেন্দ্র ধত্রি তার ঠাকুরদার জীবন সম্পর্কে গবেষণা করেছেন এবং ভারতে এই মহান বিখ্যাত ব্যাক্তি সম্পর্কে মানুষকে জানাতে চান। দামুর জীবন কাহিনী চমৎকার, উল্লেখ করে মাহেন্দ্র ধত্রি বলেন যে “তিনি তখন সেই বৃটিশ শাসনামলের ভারতে তার এ পেশা শুরু করেছিলেন এবং তখন একজন ভারতীয় হয়ে সাদা চামড়ার মানুষদের পাশ কাটিয়ে কোন পেশায় বিখ্যাত হওয়া ছিল একটি অসম্ভব ঘটনা।“

দামু ধত্রি পুণে শহরের পশ্চিমে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার বয়েস যখন মাত্র ১০, তখন হতেই তিনি তার মামার সার্কাসে নিয়মিত যেতেন।

সার্কাসের বন্য প্রানীদের ব্যাপারে তার ছিল অদম্য কৌতূহল এবং সে বয়সেই দামু সেখানে ট্রেনাররা এসব বন্য প্রাণিদের কিভাবে প্রশিক্ষণ দেয় তা দেখে আসতেন এবং নিজে একা একা খাঁচার বাহিরে সেসবের অনুকরণ করতেন।

একদিন খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে দামু সে বয়সেই খাঁচার ভেতর প্রবেশ করেন এবং হিংস্র প্রাণিগুলোকে শান্ত রাখতে সক্ষম হন। যদিও সেটি ছিল অল্প কয়েক মিনিটের ব্যাপার, কিন্তু আশেপাশের সবাই বুঝতে পেরেছিল যে এ কিশোরের মধ্যে স্পেশাল কিছু আছে।

এ ঘটনার পর সবাই বুঝে নেয় যে এ কিশোরের মধ্যে কোন ভয় কাজ করেনা এবং তার সাহসের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। দামুর এ আগ্রহ দেখে তার মামা তাকে এ ব্যাপারে ট্রেনিং দেয়ার আগ্রহ দেখালেও দামুর মা ছেলের নিরাপত্তার দিক চিন্তা করে তাকে সার্কাসের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করার চেস্টা করেন। পরে তার মামা তার মাকে আশ্বস্ত করলে দামুকে নিজের সার্কাস দলে ভিড়ান এবং এ থেকেই এই লিজেন্ডারি ট্রেনার দামু ধত্রির উত্থানের জন্ম।

১৯১২ সালে দামু স্কুলের লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে মামার সার্কাস দলের সাথে বেরিয়ে পড়েন এবং পরের চার বৎসর বিভিন্ন এলাকায় সার্কাস দলের সাথে ঘুরে বেড়ান। চার বছরের মাথায় দামু নাড়ির টানে বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়ি ফিরে আসলেও তার মন পড়ে রইল সার্কাসে। এদিকে টাকাপয়সাও উপার্জন করা দরকার।

তখন দামু মটর সাইকেলে স্টান্ট দেখানো শুরু করেন এবং এতে তার নামডাকও হলো। কিছু পত্রিকা তাকে ‘boy wonder’ নামে উল্লেখও করল। দামু পুনের বাইরেও মটর সাইকেল স্টান্ট দেখিয়ে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু এর ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই এনিমেল ট্রেনার হিসেবে কাজও করতে লাগলেন।

বয়স ২২ হতেই দামু মটরসাইকেল স্টান্ট ম্যান হিসেবে রাশিয়ান একটি সার্কাস দলে নাম লেখালেন। এ কাজ করতে করতে তিনি তার রাশান মালিককে বুঝিয়ে রিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতে লাগলেন। তবে তার জীবনের মোক্ষম সময় এসেছিল এর পর। এ সার্কাস দলটি চীনে গিয়ে যখন শো করতে লাগল, তখন দামু একনামে সেখানে বিখ্যাত হয়ে গেল। দামু একসাথে এক খাঁচায় এক ডজনের বেশী হিংস্র প্রাণি নিয়ে খেলা দেখাতে পারত। তার পোশাকও তাকে বিখ্যাত করেছিল। সাধারণত রিং মাস্টাররা নিজের নিরাপত্তার জন্য গায়ে কয়েক প্রস্থ কাপড় এবং প্রটেক্টিভ কিছু ব্যাবস্থা নিতেন। কিন্তু দামু ছিল এ ব্যাপারে দারুণ। খালী গায়ে মাথায় ভারতীয় পাগড়ি পরে হিংস্র প্রাণিদের সাথে দামুর সাহসী খেলার দৃশ্যই দর্শকদের আকৃষ্ট করত। সার্কাসের রিং এর ভেতর দামু ছিল অসাধারণ। তার একটি প্রীয় শো ছিল একটি বাঘ তার পিঠের উপর একটি ছাগল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ বাঘ ছাগল দেখলেই তাকে শিকার করাটা ছিল একমাত্র স্বাভাবিক ঘটনা।

এত জনপ্রীয়তা স্বত্ত্বেও দামুর মধ্যে একটা অনুভূতী কাজ করত যে, এই রাশান সার্কাস দলটি তার নিজের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র নয়। দামু মনে মনে আরো বড় কোন কিছুর আকাঙ্ক্ষা বয়ে বেড়াতো। দামু তখন একটি ইউরোপিয়ান সংবাদপত্রে নিজের সম্পর্কে বিজ্ঞাপন দিলেন। এক ফ্রেঞ্চ সার্কাস দলের মালিক তখন তাকে ইউরোপ আসতে বললেন।

১৯৩৯ এর জানুয়ারীতে দামু নিজের সকল অর্থকড়ি ব্যয় করে ফ্রান্সে আসেন। শুরুতে কিছুটা দৈন্যদশায় থাকলেও খুব শীঘ্রই দামু ফ্রান্সেও বিখ্যাত হয়ে গেলেন। ততদিনে দামু বিয়ে করে ফেলেছিলেন এবং তার তিন পুত্র সন্তানও ছিল। কাজেই তাদের জন্যেও তিনি যথেষ্ট অর্থকড়ি পাঠাতে পারতেন। কিন্তু দামুর এ সাফল্যটা বেশিদিন টিকেনি। এর মধ্যে দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ১৯৪০ এর মাঝামাঝি সময়ে সার্কাস নিষিদ্ধ হয়ে গেল। দামু ভেংগে পড়লেন। ফ্রান্সে একা একা নিসংগ জীবন এবং কোন আয় রোজগার নেই। এ সময়টা ছিল তার জীবনের অন্যতম একটা কঠিন সময়।

তখন এ ফ্রেঞ্চ সার্কাস দলটি ঠিক করল যে তারা আমেরিকা যাবে এবং তারা দামুকে তাদের সাথে যেতে বলল। দামু সাথে সাথেই রাজী হয়ে গেল। কারণ আমেরিকা ছিল সেসময়ে বিখ্যাত Ringling Brothers Circus দলের দেশ। আমেরিকা পৌছেই দামু রিংলিং ব্রাদার্স সার্কাস দলের সাথে যোগাযোগ করলেন। তারা রাজী হলো এবং দামু তখন  রিংলিং ব্রাদার্স সার্কাস দলে যোগ দিলেন। আমেরিকার মানুষেরা এরকম সাহসী রিং মাস্টার এর আগে দেখেনি এবং দামুর মতো এরকম দক্ষ রিং মাস্টারের শো আগে কখনো দেখেনি। দর্শকরা তাকে এবং তার শো ভালোবেসে ফেলল।

কিন্তু ১৯৪১ সালে আমেরিকা দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধে নাম লিখিয়ে ফেলল এবং সার্কাস এখানেও নিষিদ্ধ হয়ে গেল। তখন দামু ইউ এস আর্মিতে কর্পোরাল হিসেবে যোগ দিলেন। ১৯৪৫ এ যুদ্ধ শেষ হলে দামু আবার রিংলিং ব্রাদার্স সার্কাসে ফিরে আসেন। এদের সাথে তিনি ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত থাকলেন। শারীরিক দূর্বলতার জন্য এখানে চাকুড়িটা ছেড়ে দিয়ে ইউরোপে ফেরত গেলেন। এর দু বছরের মাথায় ভগ্ন শরীর এবং অসুস্থতার জন্য দেশে ফিরে আসেন।

ততদিনে তার স্ত্রীর শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। দামু বাড়ি পৌছার আগেই তার স্ত্রী মারা গেলেন। দামু তখন এজমার রোগী, তাই তিনিও বাড়ি ফিরে সার্কাসের জগত হতে নিজেকে গুটিয়ে নেন। তবে দামু নিজেকে সত্যিই গুটিয়ে আনতে পারেননি। তিনি তখন অন্য নতুন রিং মাস্টারদের প্রশিক্ষণ দিতেন।

১৯৭১ সালে ইন্টারন্যাশনাল সার্কাস হল অব ফেইম এ দামুকে সম্মান দেয়া হলো। এর দু বছর পর তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন।

আজকের প্রেক্ষাপটে প্রাণীদের নিয়ে এ ধরণের সার্কাস শো করার করার ব্যাপারকে নিষ্ঠুরতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সে সময়ে, দামু যখন রিং মাস্টার হিসেবে শো করতেন তখন এগুলোকে এ ধরণের বিবেচনায় দেখা হতো না। তার নিজের যে বিষয়ের প্রতি প্যাশন ছিল, তাকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং দামু দেখিয়ে গিয়েছেন যে ইচ্ছা এবং আগ্রহকে পূর্ণমাত্রায় চর্চা করলে স্বপ্নপূরণ অবশ্যই সম্ভব।

(উপরের বর্ণনাটি বিবিসির ওয়েব সাইটে বর্ণিত The Indian animal trainer who became a circus legend ফিচারের অনুবাদ)

অনুবাদ : বোরহান মাহমুদ
সূত্র : বিবিসি

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top