নিউটন – সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজ্ঞানী

নিউটন

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজ্ঞানী

এ পৃথিবীতে হাজারো মত প্রচলিত থাকলেও একটি ব্যাপারে সবাই একমত যে, আইজ্যাক নিউটন ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। মধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা আসলেই সবার আগে যে নামটি আসে, তিনি হলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন। তিনি একাধারে পদার্থবিদ, রসায়নবিদ, দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ, গণিতবিদ ও অর্থনীতিবিদ ছিলেন! নিউটনের জীবনকাহিনী খুবই ঘটনাবহুল, অদ্ভুত এবং রহস্যময়।

এই নিউটন ১৬৪২সালের ২৫ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের ইলসথর্প গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তার বাবার নাম ও ছিল আইজ্যাক নিউটন।  নিউটনের  জন্মের ৩মাস আগেই তার বাবার মৃত্যু হয়। তার বয়স যখন ২বছর তখন  তার মা হেনা পুনরায় বিয়ে করেন বার্নাবাস স্মিথ নামে এক ধর্মযাজককে। খুবই দয়ালু ব্যাক্তি ছিলেন এই বার্নাবাস। নিজের ইচ্ছেতেই তিনি কিছুটা জমি লিখে দিয়েছিলেন নিউটনের নামে। তবে নিউটনের মামারা তাকে নিয়ে যান তাদের বাড়িতে। সেখানেই মামাদের কাছে ছোটবেলা কাটে নিউটনের।

ছয় বছর বয়সে প্রথম স্কুলে ভর্তি হন,   অখ্যাত সেই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন তিনি। এরপর ১৬৫৪সালে  ভর্তি হন গ্র্যান্টহাম শহরে অবস্থিত কিংস স্কুলে। মামাবাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে অবস্থিত এই স্কুলটিতে প্রথম প্রথম হেটেই যেতে হতো নিউটন কে। পরে তার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় গ্র্যান্টহামে বসবাসকারী ক্লার্ক নামে এক ওষুধ বিক্রেতার বাড়িতে। ভদ্রলোকের স্ত্রী ছিলো নিউটনের মায়ের বান্ধবী।  সেই সুবাদেই এ ব্যবস্থায় থাকার সুযোগ হয় তার।

মাত্র বারো বছর সংসার করার পর নিউটনের মা আবারো বিধবা হন। তিনি তখন দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ফিরে আসেন উলসথর্পে নিউটনের আদি বাড়িতে। সাংসারিক কাজে সাহায্য করার জন্যে তিনি নিউটনকে গ্র্যান্টাহান শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন। ফলে বন্ধ হয়ে যায় তার লেখাপড়া।

ছেলেবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি অসীম আগ্রহ ছিলো নিউটনের। তাছাড়া হাতুড়ি আর স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে নানা রকম জিনিস বানাতেও খুব ভালোবাসতেন তিনি। আর ভালোবাসতেন বিজ্ঞান বিষয়ক বই পড়তে। বই পড়ার প্রতি এতো বেশি ঝোক ছিলো যে তার মা যখন তাকে খেতখোলার তদারকি করতে পাঠাতো তখনও তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন একগাদা বই। ফলে খেতখোলার কাজের দিকে মনযোগ দেওয়া প্রায় হতোইনা। তার  এ অভ্যেসটি এতোই বেড়ে গিয়েছিলো যে তার মা তাকে আবারো  ভর্তি করিয়ে দেন গ্র্যান্টহামের সেই স্কুলে। আবারো নিউটনের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় ক্লার্কের বাড়িতে।

স্কুল জীবন শেষ করে তিনি ১৬৬১সালে ট্রিনিটি কলেজ  এবং ১৬৬৫ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন নিউটন। ১৬৬৫ সালের প্রথম দিকে ইংল্যান্ড জুড়ে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়লে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় ফলে নিউটন ফিরে আসে নিজের মায়ের কাছে। এখানে বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার অফুরন্ত সময় পান তিনি। একের পর এক পড়ে চলেন বিজ্ঞানের নানা বই। অভাবনীয় দ্রুততার সাথে বেড়ে চলে তার জ্ঞানের পরিধি।

গ্রামের বাড়িতে নিউটনদের একটি ফলের বাগান ছিলো। একদিন একটি আপেল গাছের নিচে বসে ছিলেন নিউটন। হঠাৎ করে গাছ থেকে ঝরে পড়ে একটি লাল টুকটুকে আপেল। এটি ছিলো খুব সাধারণ একটি দৃশ্য। কিন্তু সেই সাধারণ দৃশ্যটি দেখেই সেদিক চমকে ওঠেন নিউটন। তিনি ভাবেন,গাছ থেকে আপেলটি নিচে পড়লো কেনো? ওটা তো উপর দিকেও যেতে পারতো! তবে কি কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে নিচে টেনে নামিয়েছে?

এই উদ্ভট প্রশ্নটি তোলপাড় করে তোলে নিউটনকে।কোনো কিছু উপর থেকে কেনো নিচের দিকে পড়ে?-এ নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যান তিনি। শুধু আপেল নয়, চাঁদ তারা গ্রহ নক্ষত্র এসবের কথাও মনে আসে তার। অনেক গবেষণা ও পড়ালেখার পর অবশেষে নিউটন বুঝতে পারেন, প্রতিটি জিনিষ ই অপর জিনিষ কে তার নিজের দিকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ শক্তির পরিমাণ যার যতো বেশি,  তার পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে অপর জিনিসটিকে ততো সহজে নিজের দিকে টেনে নেয়ার। নইলে আপেলটি উড়ে যেতো আকাশের দিকে।

একটানা দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ১৬৬৮ সালে খুলে দেয়া হয় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে নিউটন ফিরে আসেন কেমিব্রিজে। প্রথম সূত্রে নিউটন প্রকাশ করেন গণিতশাস্ত্রের ফ্ল্যাক্সিয়ান নীতি। সমস্ত গনিত বিদ্যাই এ নীতির উপর নির্ভরশীল। তবে নিউটনের প্রধানতম উদ্ভাবন ছিলো  ‘ইন্টিগ্যাল ক্যালকুলাস’। এটি উদ্ভাবিত না হলে বিজ্ঞানের  উন্নতি সাধন বহুলাংশেই ধীরগতির হতো।

নিউটনের ২য় উদ্ভাবন ছিলো গঠন সম্পর্কীয় মূল নীতি। আর ৩য় উদ্ভাবন ছিলো মাধ্যাকর্ষণ মূল নীতি। এসব চিন্তাধারার সূত্রপাত হয় ১৬৬৫ থেকে ১৬৬৭ সালের মাঝামাঝি। কিন্তু সেই চিন্তাধারাকে মতবাদ হিসেবে প্রমাণ করতে তার সময় লেগে যায় সারাটা জীবন। ১৬৮৯ সালে নিউটন প্রথম প্রতিবিম্ব টেলিস্কোপের ধারণা লাভ করেন। সে যুগের তুলনায় এটি ছিলো একটি এটি অগ্রসরমান প্রযুক্তি।

নিউটন ছিলেন একজন প্রচার বিমুখ মানুষ। বিজ্ঞানের মৌলক বিষয়ের সূত্রগুলো ১৬৬৯ সালের ভেতরে উদ্ভাবন করে ফেললেও তা প্রকাশে অনাগ্রহ দেখা যায় তার মাঝে। এজন্যে গবেষণালব্ধ অনেক ফলাফল থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়েছে বলেও আশঙ্কা করা হয়। নিউটনের প্রথম নিবন্ধ প্রকাশিত হয় ১৬৭২ সালে। আলোক সম্পর্কিত এ প্রবন্ধে নিউটন উল্লেখ করেন, সাদা আলো হিসেবে আমরা যে আলো দেখতে পাই তার ভেতর রয়েছে সাতটি রঙ্গের অস্তিত্ব। সাদা রঙ লাল, নীল, আকাশী,  হলুদ, বেগুনি, সবুজ ও কমলা রঙ্গের সংমিশ্রণ ছাড়া আর কিছুই নয়। এ নিবন্ধন প্রকাশিত হবার সাথে সাথে সাড়া পড়ে যায় বিজ্ঞানীদের মাঝে।  প্রশংসা ও সমালোচনায় মুখরিত করেন অনেকেই।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর নিউটনের জ্ঞান ছিল উল্লেখ করার মতো। এ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণাও করেছেন তিনি। তাই অনেক জ্যোতির্বিদই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন নিউটনের সাথে। সেই সূত্রধরে বিখ্যাত বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালি নিউটনের সাথে সাক্ষাৎ করেন ১৬৮৪ সালে। প্রিন্সিপিয়ার প্রথম খন্ডে গতির সূত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন নিউটন,  পদার্থবিদ্যার শুরুতে এসব সূত্র ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যন্ত সফলতার সাথে। এগুলো নিউটন’স- ল নামে খ্যাত।

নিউটন তার প্রথম সূত্রে বলেন, যে বস্তু ধীর থাকে তাকে বল প্রয়োগে গতিশীল করে তোলা না পর্যন্ত সে স্থির থাকে। গতিশীল বস্থু একই গতিতে অনবরত একই দিকে চলতে থাকবে। আর বস্তুর মাঝে গতি সৃষ্টির জন্যে অবশ্যই একটা শক্তির অস্তিত্ব থাকতে হবে। গতি পরিবর্তনের হারের মাধ্যমে শক্তির পরিমাণ করা সম্ভব।-এ ছিলো নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র। গতির তৃতীয় সূত্রে নিউটন বলেন, প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি প্রতিক্রিয়া আছে,  এই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সমানুপাতিক এবং বিপরীরমুখী। একে নানা ক্ষেত্রে কাজে লাগানো সম্ভব।

শুধু বিজ্ঞানী হিসেবেই নয়, রাজনীতিক হিসেবে ও সফল ব্যক্তিত্ব ছিলেন নিউটন।  তার রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতি আস্থা দেখিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয় তাকে। ১৬৯০ সালে পার্লামেন্ট মেয়াদ শেষ করে নতুন ভাবে গবেষনায় আত্ননিয়োগ করেন তিনি।

এভাবে অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে ক্রমেই তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। ১৬৯২ সালে তার জীবনে নেমে আসে দুঃসহ অনিদ্রা রোগ।  এ অবস্থায় চিকিৎসকরা তাকে বিশ্রাম নেয়ার জন্যে পরামর্শ দেন। সুতরাং বিজ্ঞানের অঙ্গন থেকে সরে দাড়াবার ইচ্ছে নিয়ে কেমব্রিজ ত্যাগ করেন নিউটন। ১৬৯৬ সালে জাতীয় টাকশাল নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে তাকে উন্নীত করা হয় মাস্টার অব মিন্ট পদে। টকশালের চাকরি পাবার পর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে নিউটনকে চলে আসতে হয় লন্ডনে।

১৭০৪ সালে আলোকবিজ্ঞানের ওপর একটি বই লিখেন তিনি। আলোর গঠন, প্রকৃতি, গতি ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণে ভরপুর এই বইটি প্রকাশিত হবার পরপর বিজ্ঞানীদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৭০৫সালে বিজ্ঞানের উন্নয়নে অভাবনীয় অবদান রাখার জন্যে রানী এ্যান  নিউটনকে স্যার উপাধির সম্মানে ভূষিত  করেন।

অতিরিক্ত খাটুনি ও বয়সের কারণে এ সময়ে থেকে দ্রুত অবনতি ঘটে নিউটনের স্বাস্থ্যের। এভাবেই কেটে যায় কয়েকটি বছর। এদিকে ১৭২২সালে পাথুরে রোগে আক্রান্ত হয় নিউটন।

নিউটন ছিলেন কর্মপাগল মানুষ। কিছুটা সুস্থ বোধ করলেই লন্ডনে ফিরে এসে কাজের মাঝে ডুবে যেতেন। এভাবে তিনটি বছর কাটানোর পর ১৭২৭ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি রয়েল সোসাইটির অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্যে লন্ডনে ফিরে আসেন নিউটন।  অনুষ্ঠান শেষ হবার পরপরই তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তারের পরামর্শে তিনি কিছুটা সেরে ওঠলেও ১৮ই মার্চ সন্ধ্যায় আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সেই রাতেই এক কর্মময় জীবনের অবসান ঘটিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিলো পঁচাশি বছর তিন মাস দুই দিন। মৃত্যুর প্রায় দশ দিন পর ১৭২৭ সালে ২৭ মার্চ লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার এ্যাবিতে সমাহিত করা হয় ইংল্যান্ডের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে বিজ্ঞানীদের মাঝে তাকেই প্রথম সমাহিত করা হয় এই স্থানে।

সত্যি কথা হলো, এমন ছোট আয়তনের লেখায় নিউটনের মতো আকাশছোঁয়া প্রতিভার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু এই টুকু বলা যায়, সেদিন যদি নিউটনের জন্ম না হতো, আজ তবে বিজ্ঞান এতোটা পথ এগোতে পারতোনা। অথচ, নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে চিরকুমার আত্মভোলা এ বিজ্ঞানী বলেছিলেন, “অগ্রজ বিজ্ঞানীদের সফলতার ওপর নির্ভর করেই আমি এ যাবত অগ্রসর হয়েছি। নিজের সম্পর্কে ভাবতে গেলেই মনে হয়, একটি আবোধ শিশুর মতো সাগর তীরে দাঁড়িয়ে আমি শুধু নুড়িই কুড়িয়ে গেলাম। এই বিশাল জ্ঞানসমুদ্র আমার কাছে অজানাই থেকে গেলো”।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top