আল হাকিমঃ রহস্যময় এক শাসকের ইতিবৃত্ত

আচ্ছা ভাবুন তো আজ যদি বাংলাদেশ সরকার এমন একটি আইন প্রণয়ন করে বসে যে, দিনের বেলা সব ধরণের লেনদেন, দোকানপাট ইত্যাদি বন্ধ রেখে বিশ্রাম করতে হবে এবং রাতে না ঘুমিয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে নিতে হবে তবে কেমন হত? নিশ্চয়ই ভাবছেন এটা আবার হয় নাকি! এ তো পাগলের কাণ্ডকারখানা। তবে পাঠক শুনে আপনি অবাক হবেন ঠিক এমন একটি আইন প্রণয়ন করেছিলেন ফাতেমীয় খিলাফতের একজন অদ্ভুতুড়ে খলিফা। শুধু এ আইন নয় আরো সব কিম্ভুতকিমাকার আইন প্রণয়ন করে তিনি ইতিহাসে পরিচিত হয়ে আছেন ‘পাগলা হাকিম’ নাম। নাম তার আল হাকিম। তার বিচিত্র জীবন সম্পর্কে জানবার আগে কিছু কথা বলে নেয়া জরুরি।

মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ আব্বাসী সাম্রাজ্যের ভিত্তি যখন নড়বড়ে, গৌরব যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে- ঠিক তখন দশম শতাব্দীর শুরুর দিকে ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে ওবায়দুল্লাহ আল মাহদি উত্তর আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করেন ফাতেমীয় খিলাফত। মূলত আব্বাসী রাজবংশকে টেক্কা দিতেই আগলাবীয় বংশের জীর্ণ দেহাবশেষের উপর তিনি এ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। আর এ সাম্রাজ্যেরই ষষ্ঠ খলিফা আবু আলী মনসুর আল হাকিম নামক দ্ব্যর্থক  মানসিকতার খলিফাকে নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

ফাতেমীয় খিলাফতের পঞ্চম খলিফা আল আজিজের ঔরসে ৯৮৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন আবু আলী মনসুর আল হাকিম। আল আজিজ তার আরেক পুত্র মোহাম্মদকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে যান। কিন্তু বিধি বাম, পিতা আল আজিজের মৃত্যুর আগেই মনোনীত উত্তরাধিকারী মোহাম্মদ মারা যান। এই শূন্যস্থানে মাত্র ১১ বছর বয়সে ৯৯৬ সালে আল হাকিম খলিফার আসনে অধিষ্ঠিত হোন। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় খলিফার রাজপ্রতিনিধি হিসেবে জনৈক বার্বার, আল হাসান ইবনে আম্মার দায়িত্ব পালন করেন। হুট করে তার এ সর্বেসর্বা হয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারছিলনা তুর্কি সেনারা, যারা কিনা খলিফার সেনানিবাসে প্রভাব বিস্তার করত। আল আজিজের আমলের প্রাদেশিক শাসনকর্তা তুর্কি বারজোয়ান এ ক্ষোভকে পুঁজি করে আম্মারকে হত্যা করে পরোক্ষভাবে সিংহাসনে কলকাড়ি নাড়তে লাগল। কিশোর খলিফা হাকিম তার এ জবরদখল সইতে না পেরে গুপ্তঘাতক বা হাসাসিন্সদের মাধ্যমে তাকে হত্যা করে পুরো ক্ষমতা নিজের করায়ত্ত করেন। ক্ষমতা পেয়েই তিনি তার অদ্ভুতুড়ে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন।

কারো কারো মত, খলিফা ছিলেন মানসিক বিকারগ্রস্ত, কারো মতে খেয়ালি, আনমনা। তবে তার খেয়ালিপনার প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় ১০০১ সালে। তিনি রাজ্যে এক অদ্ভুত ফরমান জারি করেন। তিনি ঘোষণা দেন যে, এখন থেকে সবধরণের কাজকর্ম, লেনদেন রাতে হবে আর দিনে সবাই বিশ্রাম নিবে”।

তার এ ঘোষণার নেপথ্যে কি কারণ থাকতে পারে তা আঁচ করতে পারেননি ঐতিহাসিকেরা। তবে কিছু ঐতিহাসিক একে তার খেয়ালি চরিত্রের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

১০০৪ খ্রিষ্টাব্দে আবার পটে হাজির হলেন হাকিম। এবার বন্দুক তাক করলেন কিছু নির্দিষ্ট সবুজ শাকসবজির দিকে! শুধুমাত্র হযরত মুয়াবিয়ার প্রিয় খাবার ছিল বলে মুলুখিয়াহ নামের এক ধরনের খাবার নিষিদ্ধ করা হল। একই সময়ে হযরত আয়েশার পছন্দের ছিল বলে জিরজির নামক এক প্রকার সালাদও নিষিদ্ধ করা হয়।

তার রাজ্যে সূর্যাস্তের পর বাইরে বের হওয়া রহিত করা হয় যদিও পরে তা শিথিল হয়ে যায়।

তার আরেকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, রাজকীয় নির্দেশে কায়রো শহরে কুকুর নিধন। পলকের ভিতর কায়রোর কুকুরদের উপর স্টিম রোলার চালান খলিফা আবু আলী মনসুর আল হাকিম!

এরপর আশুরায় শোক পালন রদ করা হয়, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় অথবা গলায় বড় করে ক্রুশ চিহ্ন পরে অবনমিত জাতি হিসেবে চলতে বলা হয়। অমুসলিমদের অতিরিক্ত কর প্রদানে বাধ্য করা হয়, আবার একই সাথে এদের উচ্চ রাজকার্যে নিয়োগ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন তিনি কতটা দ্বিধান্বিত।

অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ডে আপাতদৃষ্টিতে তাকে বোকাসোকা, খামখেয়ালি বা আনমনা মনে হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনায় তিনি অনন্য অবদান রেখে গিয়েছেন। ১০০৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দারুল হিকমা বা বিজ্ঞান ভবন যেখানে বিশ্বের নামিদামী বিদ্বানগণ এসে গবেষণাকার্য পরিচালনা করতেন। মিশর ও সিরিয়ায় তিনি অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন আরো একটি কাজে। বর্তমান লেবাননের বহুল প্রচলিত শিয়া মুসলিম শাখার অন্যতম উপশাখা দ্রুজ ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা তিনি, যা বর্তমান সিরিয়া এবং ইসরায়েলে বিস্তার লাভ করেছে।

আবু আলী মনসুর আল হাকিমের চরিত্রে যে দিকটা উল্লেখ করতেই হয় সেটা হচ্ছে তিনি নির্জনতা পছন্দ করতেন। মুকাত্তাম নামক পাহাড়ের পাদদেশে তার প্রতিষ্ঠিত মানমন্দিরে প্রায় সময়ই একা বসে থাকতেন তিনি। কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করতেন তিনি প্রার্থনা বা নক্ষত্র অবলোকনের জন্য সেখানে যেতেন।

এমনি এক রাতে নির্জনতায় ডুবে গিয়ে আর ফিরে আসেননি আল হাকিম। ধারণা করা হয় গুপ্তঘাতকরা মুকাত্তাম পাহাড়েই তাকে হত্যা করে।

১০২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি তার বিচিত্র সত্তা আর অস্তিত্ব নিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে ইহজগতের মায়া ত্যাগ করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top