ন্যান্সি ওয়েক – দ্যা হোয়াইট মাউস খ্যাত বৃটিশ স্পাই

ন্যান্সি ওয়েকব
দ্যা হোয়াইট মাউস খ্যাত বৃটিশ স্পাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ স্পাইদের মধ্যে অন্যতম ভয়ঙ্কর স্পাই ছিলেন ন্যান্সি ওয়েক। তার ক্ষমতা গেস্টাপো বাহিনীর দিকে তাকালেই বুঝা যায়, গেস্টাপো বাহিনী তাকে ধরতে না পেরে তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য বিনিময়মূল্য ঘোষণা করেন। ন্যান্সি তার দূরদর্শীতা ব্যবহার করে গেস্টাপো বাহিনীর সামনে দিয়েই বারংবার চলাচল করলেও তারা তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় নি।

ন্যান্সি ওয়েকের জন্ম ৩০ আগস্ট ১৯১২ সালে, নিউজিল্যান্ডে। তার বাবা মা প্রাথমিকভাবে অস্ট্রেলিয়ায় গমন করলে ওয়েকের পড়াশোনা শুরু হয় সিডনিতেই। পরে বাবা মা নিউজিল্যান্ডে ফিরলেও ন্যান্সি ওয়েক নিউ ইয়র্ক হয়ে লন্ডনে গমন করেন। সেখানে তিনি নিজের পছন্দ অনুযায়ী সাংবাদিকতার উপরে পড়াশোনা শুরু করেন। তার এই সাংবাদিকতাই তার পরবর্তী জীবনের গতি নির্ধারণ করে দেয়।

 ১৯৩০ সালে প্যারিসে সাংবাদিকতা করার সময় হার্স্ট নামক দৈনিক পত্রিকার ইউরোপীয়ান প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন। তখন ওয়েক জার্মানিতে উপস্থিত হন সাংবাদিকতার কাজে। ভাগ্যক্রমে ১৯৩৩ সালে ভিয়েনায় হিটলারের সাক্ষাৎকার নেন ন্যান্সি। হিটলারের কাছে জানতে চান, ‘শিশুর হাসি কেমন লাগে?’ জবাবে হিটলার বলেন, ‘সব শিশুর হাসি ভাল লাগে না। যারা অনাদরে বেড়ে ওঠা শিশু তাদের ভাল লাগে। অন্যদের না’। ন্যান্সি এই একটি কথায় বুঝতে পারেন তার মধ্যে শ্রেনীবিদ্বেষ আছে এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী বলে ফ্যাসিস্ট হিসেবে ভয়ংকর। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর উত্থান, ইহুদিদের প্রতি নাৎসি বাহিনীর অত্যাচার স্বচক্ষে দেখে আসেন তিনি।   তিনি  হিটলারকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন। এটা তাকে গোয়েন্দা হিসেবে নাৎসি বাহিনীর কাছে সহজে পৌঁছার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। সেই সুযোগ বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগান তিনি।

১৯৩৯ সালে ন্যান্সি ফ্রান্সের শিল্পপতি এডমন্ড হেনরি এর সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। ছিলেন সাংবাদিক, কিন্তু জার্মানি যখন ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন ন্যান্সি যোগ দেন প্রতিরোধ লড়াইয়ে।  বিয়ের পর  যোগ দেন ফ্রান্স রেজিস্ট্যান্সের গেরিলা বাহিনী মাকিসে। গেস্টাপো তাকে বারবার ধরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। অদ্ভুত কৌশলে ধরা পড়ার হাত থেকে বেঁচে যান তিনি। গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ১৯৪০ সালের ডিসেম্বরে জার্মানদের হাতে একবার ধরা পড়েন। অবাক করা ব্যাপার, বন্দী শিবির থেকে কৌশলে পালিয়ে লন্ডনে যান ন্যান্সি।  তার এই পলায়ন কুশলতার স্বীকৃতি মিলে গেস্টাপোর বিশেষণে। গেস্টাপো তাকে ডাকত White Mouse বা ‘সাদা ইঁদুর’ বলে। ওরা তার মাথার মূল্য ধার্য করেছিল ৫০ লাখ ফ্রাঙ্ক।

১৯৪০ সালে স্বামীকে অধিকৃত ফ্রান্সে ফেলে রেখেই ন্যান্সি পালিয়ে ব্রিটেনে চলে যান এবং পরে বৃটিশ এসওই-তে যোগ দেন। আবারও গোয়েন্দার কাজে মন দেন এই ভয়ঙ্কর নারী। ১৯৪২ সালের পর গেস্টাপো বাহিনীর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার শীর্ষে ছিলেন ন্যান্সি ওয়েক। তাকে হত্যা করার জন্য উঠেপড়ে লাগে এলিট ফোর্স। হিটলারও রীতিমত টেনশনে থাকতেন এই নারী গোয়েন্দাকে নিয়ে।

 ১৯৪৪ সালে তাকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সুসংগঠিত করার। তিনি সুচারুরূপে সেই দায়িত্ব পালন করে গড়ে তোলেন সাত হাজার যোদ্ধার একটি দল। এ দলটি প্রায় সময় গেস্টাপোদের ওপর হামলা চালাত।

এ সময় একবার তিনি ৭১ ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে ৩০০ মাইল পথ পাড়ি দেন। পথিমধ্যে অতিক্রম করেন অনেকগুলো জার্মান চেকপোস্টও। আরেকবার এক জার্মান সেনাঘাঁটিতে অভিযান চালাতে যান তারা। যোদ্ধাদের দেখেই অ্যালার্ম বাজাতে যায় জার্মান সেন্ট্রি। কিন্তু তার আগেই খালি হাতে তাকে হত্যা করেন ন্যান্সি ওয়েক। তার এক সহযোদ্ধা তাই বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত সে ছিল আমার দেখা সবচেয়ে নারীসুলভ মহিলা। কিন্তু তার পর সে হয়ে গেল পাঁচজন পুরুষের সমান।

যুদ্ধ শেষের পর সবচেয়ে খারাপ খবরটি পেলেন ন্যান্সি। তার স্বামীকে গেস্টাপোর এজেন্টরা গুলি করে মেরেছে। কারণ, তিনি ওদেরকে তার বিষয়ে কোনো খোঁজখবরই দেননি। ন্যান্সি তার কৃতিত্বের জন্য ইউএস প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেলসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পদক লাভ করেন। ২০১১ সালে ৯৮ বছর বয়সে লন্ডনে তার মৃত্যু হয়। ন্যান্সি ওয়েক; দ্যা হোয়াইট মাউস নামে তার জীবনীর উপর ২০১৪ সালে একটি সিনেমা তৈরি হয়।

সূত্রঃ https://allthatsinteresting.com/nancy-wake

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top