গ্রিক নয়, মেসিডোনীয় বীর আলেকজান্ডার বললেন ‘বেয়াদপ যা করে আমি তা করি না’

গ্রিক নয়, মেসিডোনীয় বীর আলেকজান্ডার বললেন ‘বেয়াদপ যা করে আমি তা করি না’।

বিশ্বজয়ের নেশায় সসৈন্যে দিকবিদিক অভিযানরত আলেকজান্ডার তখন মিশর জয় করেছেন। মিশর ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের অধীন। তখনকার (এবং প্রায় ক্ষেত্রে এখনকারও) রীতি অনুযায়ী পরাজিত পক্ষকে কচুকাটা বা দমন-নিপীড়ন নির্যাতন ছিল খুবই স্বাভাবিক।

সেই মোতাবেক মিশরীয় আর সেদেশে জাঁকিয়ে বসা পারসিক অভিজাতরা (সেনাপতি, মন্ত্রী, শীর্ষ ব্যবসায়ী) শঙ্কিত চিত্তে অপেক্ষমান ছিলেন- ভাগ্যে আলেকজান্ডার বাহিনীর হাতে কতটা জিল্লতি-অপমান লেখা আছে তা দেখার জন্য।

কিন্তু তরুণ মেসিডোনীয় সম্রাট আলেকজান্ডার সেরকম কিছুই করলেন না। তিনি দেশটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেন। ব্যাপক খানা-পিনা আর বাতচিতে সবাই খুব সহজ হয়ে উঠলেন। এসময় মিশরীয় অভিজাতদের একজন সবিনয়ে বিজেতা সম্রাটকে প্রশ্ন করলেন, মান্যবর আলেকজান্ডার, আমরা ছিলাম আপনার শত্রুপক্ষ। সেই আমরা পরাজিত হওয়ার পর নির্বিচার হত্যা-গ্রেপ্তারে না গিয়ে আপনি উল্টো আমাদেরকে এভাবে সম্মানিত করছেন? এই সৌজন্য, এই আদপ-কায়দা আপনি কোখায় শিখেছেন, অনুগ্রহ করে যদি আমাদেরকে বলতেন?

জবাবে ত্রিশের কোঠার যুবক সম্রাট স্মিতহাস্যে বলেন, বেয়াদপদের কাছ থেকে।

দিগ্বিজয়ী বীরের অমন  অদ্ভূতুড়ে উত্তর শুনে প্রশ্নকর্তাসহ অনুষ্ঠানে  উপস্থিত সবাই তাজ্জব, বিব্রত। সাহস সঞ্চয় করে প্রশ্নকর্তা ফের শুধোলেন, মহান সম্রাট, বেয়াদপদের কাছ থেকে মানে! আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না।

ফের স্মিতহাস্যে আলেকজান্ডার জবাব দিলেন, বেয়াদপ যা করে, আমি তা করিনা!

এই হচ্ছেন আলেকজান্ডার। এশিয়া মাইনর, ভারত, আফ্রিকা থেকে নিয়ে ইউরোপে আজকের যুক্তরাজ্য পর্যন্ত অভিযান পরিচালনাকারী এই অসীম তেজী যোদ্ধাকে ইতিহাস যথার্থই ‘দ্য গ্রেট’ (মহাবীর) উপাধি দিয়েছে। মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন সূত্রে তিনি হচ্ছেন সম্রাট জুলকারনাইন আর মধ্য এশিয়ায় তার পরিচিতি বাদশাহ সিকান্দার (ইসকান্দার) নামে।

তিনি ছিলেন মহান দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ছাত্র। আরেক মহান দার্শনিক প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটল তার এই রাজপুত্র ছাত্রকে পণ্ডিত বা দার্শনিকে রূপান্তর করেননি বা করতে পারেননি হয়তো, তবে তিনি তার মধ্যে অসাধারণ সব মানবীয়, বীরোচিত এবং রাজোচিত  গুণাবলীর স্ফূরণ ঘটিয়েছেন- এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

বিশ্ববিজেতা এই বীর জন্মেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ সালে তৎকালীন মেসিডোনিয়ার পুরনো রাজধানী পেলা শহরে। তার বাবা মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ গুণবান পুত্রকে যথোপযুক্ত একজন উত্তরাধিকারী হিসেবে গড়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। ছেলের মাত্র ১৩ বছর বয়সে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন দুনিয়ায় তৎকালীন এবং সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে।

গুরুর কাছে আলেকজান্ডার লাভ করেন রাষ্ট্রপরিচালনা, সমরবিদ্যা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, চিকিৎসাশাস্ত্র ও সর্বোপরি দর্শন সম্পর্কিত জ্ঞান যা পরবর্তীতে তার বিশ্ব অভিযানে সার্বক্ষণিক পাথেয় হয়ে থেকেছে।

আলেকজন্ডার যখন তরুণ, তখন বাবা ফিলিপ দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে মা অলিম্পিয়াসের সঙ্গে তিনি চলে যান মাতামহের রাজ্য পার্শ্ববর্তী এপিরাসে। অলিম্পিয়াস ছিলেন এপিরাস রাজের কন্যা। তবে কিছুদিন পরই তারা আবার মেসিডোনিয়ায় ফিরে আসেন। এসময় পারস্য অভিযানের প্রস্তুতিরত ফিলিপ একদিন প্রকাশ্যেই নিহত হলে সিংহাসনে বসেন তরুণ আলেকজান্ডার। অনেকেই ফিলিপ হত্যার পেছনে তার স্ত্রী অলিম্পিয়াস আর পুত্র আলেকজান্ডারের হাত রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন।

তবে সত্যমিথ্যা যাই হোক, সিংহাসনে বসেই আলেকজন্ডার শক্তহাতে শাসনক্ষমতা সুসংহত করে মনোযোগ দেন পিতার পদাঙ্ক অনুসরণে। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্যান্য সাম্রাজ্য ও দেশ জয়। বাবার অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত সেনাপতি এন্টিপাতের কাছে মেসিডোনিয়া সাম্রাজ্য শাসনের ভার রেখে তিনি বের হয়ে পড়েন এশিয়া মাইনর বিজয়ে।

এসময় আলেকজান্ডারের সঙ্গে ছিল হাজার চল্লিশেক সৈন্যের এক মোটামুটি বিশাল বাহিনী। কিন্তু ঐতিহাসিক ট্রয় নগরীর কাছের এক লড়াইয়ে পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারায়ূসের প্রায় দ্বিগুণ শক্তির বাহিনীকে হারিয়ে দেন আলেকজান্ডার। এরপর এশিয়া মাইনরের উপকূলবর্তী নগর-জনপদগুলোর দিকে অগ্রসর হন তিনি।

প্রসঙ্গত দারিয়ূসের সঙ্গে বার বার লড়াই হয়েছে আলেকজান্ডারের। প্রায় ক্ষেত্রেই হারতে হারতে জিতে গেছেন অসম্ভব রণকূশলী আর অসাধারণ  প্রত্যুৎপন্নমতিসম্পন্ন এই মেসিডোনীয় সৈনিক। এরমধ্যে বারকয়েক দারিয়ুস যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। একবার এরকম হয় যে সঙ্গে থাকা মা-স্ত্রী ও সন্তানদের ফেলেই চলে যান দারিয়ূস।

কিন্তু পরবর্তীতে মিশরে যে অসাধারণ সৌজন্যবোধ দেখিয়েছিলেন, তার অনেক আগে এশিয়া মাইনরের এ ঘটনায় দারিয়ুসের পরিবার-পরিজনদের প্রতিও সেই পর্যায়ের উদারতা ও সৌজন্যবোধ প্রদর্শন করেন আলেকজান্ডার। তিনি তাদের যথোচিত মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেন।

মিশর অভিযান থেকে ফিরে ফের দারিয়ুসের সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন আলেকজান্ডার। এবার ইরাকের ইরবিলের কাছে দারিয়ুস প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে আলেকজান্ডার বাহিনী। তবে শেষপর্যন্ত ঠিকই বিজয়ঝাণ্ডা উড্ডীন হয় মেসিডোনিয়ার। ফের পালিয়ে যান দারিয়ুস। ব্যাবিলন অধিকার করেন আলেকজান্ডার।

এ পর্যায়ে নিজরাজ্য মেসিডোনিয়া ও তার অধীনস্থ গ্রিস-স্পার্টাসহ আশপাশের রাজ্যগুলোয় বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিশ্বস্ত এন্টিপাত শক্তহাতে সামাল দেন তা। এসময় আলেকজান্ডার তার বাহিনীতে থাকা গ্রিক সৈন্যদের গণহারে ছাটাই করেন। কারণ, দারিয়ুসের সঙ্গে প্রথম যুদ্ধেও গ্রিকদের ভূমিকা তাকে যথেষ্ট ভুগিয়েছে। তার নিজ বাহিনীতে যেমন গ্রিক ছিল তেমনি দারিয়ুসের বাহিনীতেও ছিল।

কিন্তু দারিয়ুসের পক্ষের গ্রিকরা জানবাজি রাখা লড়াই করলেও আলেকজান্ডারের পক্ষের গ্রিক সেনারা অনেকটাই গা বাঁচানো আর লোক দেখানো যুদ্ধ করে। এর ভেতরের কারণটা হচ্ছে, গ্রিস তখন ছিল মেডিডোনিয়ার পদানত। স্বাভাবিকভাবেই গ্রিকরা অনেকটা ‘পাশের গাঁয়ের সেদিনকার ছেলে’ আলেকজান্ডারকে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারেনি।

আর তাই গেয়ো যোগী বা পাশের রাজ্যের সেই ছেলেটিই যে একের পর এক রাজ্য-সাম্রাজ্য পদানত করছে, যার সমরকুশলতা, বীরত্ব, নেতৃত্ব আর বিদ্যাবুদ্ধির কাছে কেউ টিকতে পারছে না- এতসব সত্য সামনে থাকা সত্যেও গ্রিকরা সেই আলেকজান্ডারের আনুগত্য মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।

যাহোক, ক্ষিপ্ত আলেকজান্ডার গ্রিকদের গণছাটাই শেষে ফের দারিয়ুসের পেছন ছোটেন। মোটকথা এই পারস্য সম্রাটের পেছনে তিনি লেগেছিলেন অনেকটা গাইডেড মিসাইলের মতো। কিন্তু শেষপর্যন্ত যখন চরম সেই শত্রুর দেখা পান তিনি, তখন দারিয়ুস মৃত। অজ্ঞাত খুনীর হাতে নিহত দারিয়ুসের মরদেহ পড়েছিল নিজের-ই রথে।

তবে এখানেও মূর্ত হয়ে ওঠেন সেই ‘গ্রেট’ আলেজান্ডার। যথাযোগ্য রাজকীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য সমাপনের মধ্য দিয়ে পরলোকগত শত্রুকে সম্মান জানান জুলকারনাইন বা আলেকজান্ডার। পারস্যকে পদানত করে, সেখানে পারসিক সংস্কৃতি আর বিভিন্ন পদে পারসিকদের বহাল রেখে (যদিও পারসিকদের ধর্মগ্রন্থ ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে) মনোযোগ দেন ভারতের পানে।

সম্রাটের বয়স তখন মাত্র ২৯ বছর।  একের পর এক রাজ্য জয় করে এগিয়ে যেতে থাকেন আলেকজান্ডার। খাইবার গিরিপথ দিয়ে বিশাল বাহিনীকে পার করে দিয়ে নিজে অল্পসংখক সৈন্য সঙ্গে নিয়ে আরও উত্তরের দিকে এগিয়ে চলেন। এসময় তক্ষশিলার রাজাকে পরাজিত করে ঝিলাম নদীর দেশ ঝিলাম রাজ্যের দিকে এগিয়ে চলেন।

এখানে রাজা পোরাস বা পুরুর সঙ্গে তার সেই বহুল আলোচিত ঘটনা ঘটে। প্রবল বিক্রমে লড়াইয়ে আলেকজান্ডারকে প্রায় পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল পুরুর বাহিনী। এখানে প্রথম হাতিদর্শন হয় আলেকজান্ডার ও তার বাহিনীর।  ঐরাবতের সামনে আলেকজান্ডারের  সৈন্যরা এবং তাদের ঘোড়াগুলো রীতিমতো ভড়কে যায়। তবে পরাজয় প্রায় ছুঁই ছুঁই অবস্থায়ও শেষ মুহূর্তে সামলে ওঠেন আলেকজান্ডার।

হারানো বিজয় ছিনিয়ে আনেন। প্রতিপক্ষের রাজা পুরুকে বন্দি করে তাঁর সামনে আনা হয়। এসময় পরাজিত রাজার কাছে তিনি জানতে চান, কী রকম আচরণ আশা করছেন তিনি আলেকজান্ডারের কাছে?

যুদ্ধাহত উপমহাদেশীয় বীর পুরু শিরোন্নত গর্ব বোধে বলীয়ান সিকান্দারকে বলেন, একজন রাজার কাছে আরেকজন রাজার যে মর্যাদা, তাই তিনি আশা করেন।

পরাজিত ও বন্দি একজন রাজার অমন দুর্দশায়ও আত্মমর্যাদাবোধের এমন দৃষ্টান্তকর জবাব মুগ্ধ করে জ্ঞানবান সম্রাটকে।  তখনি মুক্তি দেন পুরুকে এবং রাজ্য ফিরিয়ে দেন, তবে এক শর্তে- শাসন করতে হবে আলেকজান্ডারের নামে।

এছাড়া এসময়ই ভারতীয় শহর মুলতানে আলেকজান্ডার স্থানীয় এক সেনার তীরে বিদ্ধ হয়ে (কারও কারও মতে তরবারীর আঘাতে) ঘোড়া থেকে পড়ে যান। এতে তার ফুঁসফুঁস বিদীর্ণ হয় এবং পরবর্তীতে এই আঘাত তাকে ভোগায় বাকি জীবন। এদিকে রক্তাক্ত অবস্থায়ও সৈন্যদের উজ্জীবীত করে যুদ্ধে জয় ছিনিয়ে আনেন তিনি। তাকে রক্ষা করেন বিশ্বস্ত কয়েকজন দেহরক্ষী।

তবে উপমহাদেশের অনেকেই মনে করেন, ওই আঘাতেই আলেকজান্ডার মারা যান। এজন্য মুলতানের অনেক মহল আলেকজান্ডার বধের গর্বে এখনও সুখভোগ করেন মনে মনে। তবে তাদের সেই দাবি বা ধারণা সত্য নয়। ইতিহাস নির্ভর তথ্য হচ্ছে- দীর্ঘ অভিযানজনিত ক্লান্তি আর গঙ্গা নদীর বিশালত্ব এবং বাংলা-মগধা অঞ্চলের বিপুল শক্তিশালী সেনাবাহিনীর খবরে নিজ সৈন্যদের আর সামনে এগোতে অনীহা বুঝতে পেরে অভিযানে যতি টানেন তিনি।

ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, ভুলে ভরা গ্রিক মানচিত্রের তথ্য অনুসারী আলেকজান্ডারের ধারণা ছিল- ভারতই হচ্ছে পৃথিবীর শেষ সীমানা। এটাও তার ফিরে চলার একটি কারণ ছিল। এসময় তার নিজদেশেও বিদ্রোহ দেখা দেয়। তিনি ফিরে চলেন মেসিডোনিয়ায়। কিন্তু পথে পারস্য এলাকায় পৌঁছানোর পরই দিন ঘনিয়ে আসে তাঁর।

এক রাজকীয় ভোজের অনুষ্ঠানে পানাহারের পরপর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অচিরেই হারিয়ে ফেলেন হাঁটাচলা আর কথা বলার শক্তি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩৩ বছর বয়সে, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালের ৭ জুন আজীবন বিজয়ী এই বীর মৃত্যুর বশ্যতা স্বীকার করে বিদায় জানান পৃথিবীকে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, অনেকেই আলেকজান্ডারকে গ্রিক বীর বলে ভ্রম করেন। আসলে তিনি গ্রিক নন, পাশের রাজ্য মেসিডোনিয়ার নাগরিক ছিলেন।

সূত্র:

  • উইকিপিডিয়া,
  • অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়া,
  • ইউরোপিয়ান হিস্ট্রি,
  • আলেকজন্ডার দি গ্রেট প্রভৃতি গ্রন্থ

লেখক : আহসান হোসেন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top