উপমহাদেশ হতে জাপানগামী প্রথম মহিলা হরিপ্রভা তাকেদা

উপমহাদেশ হতে জাপানগামী প্রথম মহিলা হরিপ্রভা তাকেদা

হরিপ্রভা তাকেদা (১৮৯০ – ১৯৭২) প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি জাপান যাত্রা করেন। ১৯১২ সালে তিনি তার স্বামী ওয়েমন তাকেদার সাথে জাপান যাত্রা করেন। ১৯১৫ সালে তার ভ্রমণ কাহিনী ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ প্রকাশিত হয়।

হরিপ্রভার জন্ম হয় ১৮৯০ সালে, তদানীন্তন ঢাকা জেলার খিলগাওঁ গ্রামে।হরিপ্রভার বাবা শশীভূষণ মল্লিক ছিলেন ঢাকার নববিধান ব্রাহ্মসমাজের সক্রিয় কর্মী। ১৮৯২ সালে তিনি ঢাকায় নিরাশ্রয় মহিলা ও শিশুদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে মাতৃনিকেতন নামে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। হরিপ্রভার মা নগেন্দ্রবালা মাতৃনিকেতনের দেখাশুনো করতেন। তবে শোনা যায় তিনি ইডেন স্কুলে মেট্রিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন।

ছোট থেকেই তিনি মাতৃনিকেতনের সাথে যুক্ত ছিলেন। আশ্রমে কাজ করার সুবাদে তার পরিচয় হয় জাপানি যুবক ওয়েমন তাকেদার সঙ্গে। ওয়েমন তখন ঢাকার বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরিতে প্রধান কারিগর ছিলেন। তাদের পরিচয় ক্রমে প্রণয়ে পরিণত হয়। ১৯০৭ সালে উভয় পরিবারের সম্মতিতে নববিধান ব্রাহ্মসমাজের নবসংহিতা অনুসারে তাদের বিবাহ হয়।  বিবাহের পর ওয়েমন তার শ্বশুর শশীভূষণ মল্লিকের সহযোগিতায় ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত পরিষ্ঠানের আয়ের কিয়দংশ মাতৃনিকেতনে দান করা হত। বছর খানেক পরে ঢাকা সোপ ফ্যাক্টরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ওয়েমন তখন ব্যবসার পাট চুকিয়ে সস্ত্রীক জাপানে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথম জাপান যাত্রা

হরিপ্রভার জাপান যাত্রার সংবাদ প্রচারিত হতেই দেশে হইচই পড়ে যায়। দিনাজপুরের মহারাজা তাকেদা দম্পতির জাপান যাত্রার কথা শুনে তাদের ২৫ টাকা উপহার দেন। ঢাকাস্থিত জনৈক জাপানি ব্যবসায়ী কোহারা তাদের ৫০ টাকা উপহার দেন। ঢাকার নববিধান ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে তাদের যাত্রার শুভকামনা করে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।  ৩ নভেম্বর ১৯১২ হরিপ্রভা ও ওয়েমান ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে নারায়ণগঞ্জ থেকে স্টীমারে গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে কলকাতা। ৫ নভেম্বর তারা কলকাতা থেকে জাহাজে করে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।  তারা জাপানের পোর্ট মোজিতে পৌঁছন ১৩ ডিসেম্বর। হরিপ্রভার জাপানে আগমন সংবাদ জাপানের দু’টি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।

হরিপ্রভা তার প্রথম জাপান সফরে চার মাস কাটান। এই সময়ে তিনি শুধু তার শ্বশুরবাড়িই নয় জাপানের সমাজ ব্যবস্থাকেও খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। তিনি জাপানের সামাজিক রীতিনীতির খুঁটিনাটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন ও ভারতীয় সমাজের রীতিনীতির সঙ্গে তা তুলনা করতে থাকেন। ১২ এপ্রিল ১৯১৩ তারা ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দেশে ফেরার পর তিনি ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ নামে একটি ভ্রমণ বৃত্তান্ত লেখেন। সেখানে তিনি তার সমুদ্রযাত্রা, শ্বশুরবাড়ির আতিথেয়তা, ভারতীয়দের নিয়ে জাপানিদের ঔৎসুক্য, জাপানের সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে লেখেন। ১৯১৫ সালে মাতৃনিকেতনের সহায়তায় তার ভ্রমণ বৃত্তান্তটি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে।

দ্বিতীয় জাপান যাত্রা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জাপান সরকার ভারতে অবস্থানকারী সমস্ত জাপানি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নেয়। ১৯৪১ সালে হরিপ্রভা তার স্বামীর সাথে পাকাপাকিভাবে জাপান চলে যান। যুদ্ধকালীন সময়ে জাপানের আর্থনৈতিক সঙ্কট চলছিল। জাপানে তাদের বাসস্থান বা উপার্জন কিছুই ছিল না। এর মধ্যে ওয়েমন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই সময় হরিপ্রভার পাশে দাঁড়ান রাসবিহারী বসু। তার মাধ্যমে হরিপ্রভা নেতাজীর সাথে পরিচির হন। নেতাজী হরিপ্রভাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। রাসবিহারী বসুর মধ্যস্থতায় হরিপ্রভা ১৯৪২ সালে টোকিও রেডিওতে আজাদ হিন্দ ফৌজের হয়ে বাংলায় সংবাদ পাঠিকার চাকরি পান। সেই সময় টোকিও শহরে মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণ অব্যাহত ছিল। সেই পরিস্থিতিতে প্রতি রাতে হরিপ্রভা হেলমেট মাথায় দিয়ে টোকিও রেডিও স্টেশনে যেতেন। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের হয়ে বাংলায় সংবাদ পাঠ করেছিলেন।

যুদ্ধ শেষে ১৯৪৭ সালে হরিপ্রভা তার অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে দেশে ফেরেন। ১৯৭২ সালে কলকাতার শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

অসীম সাহসী, দেশপ্রেমী, আত্মবিশ্বাসী এই নারী একজন লেখকও ছিলেন। ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ ছাড়াও তিনি ‘সাধ্বী জ্ঞানদেবী’ এবং ‘আশানন্দ ব্রহ্মনন্দ কেশবচন্দ্র সেন’ নামে আরও দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। ‘জাপানে সন্তান পালন ও নারীশিক্ষা’ শিরোনামে ভারতবর্ষ পত্রিকায় তার একটি নিবন্ধও ছাপা হয়।

ঢাকার তৎকালীন খিলগাঁও গ্রামের একজন সাধারণ মেয়ে হয়ে জাপান জয় করেছিলেন হরিপ্রভা। অথচ সময়ের বিবর্তনে আজ তাঁকে ভুলতে বসেছে আপন জন্মভূমির মানুষ। তাঁর কোন স্মৃতিচিহ্ন এই ভূমির কোথাও খোঁজে পাওয়া যায় না এখন আর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top