ইদি আমিন দাদা – উগান্ডার বর্বর স্বৈরশাসক

ইদি আমিন দাদা

উগান্ডার বর্বর স্বৈরশাসক

আফ্রিকা মহাদেশের ঘৃণিত স্বৈরশাসক তিনি। যার হাতের ইশারায় নিহত হয়েছিল ১ লক্ষ মানুষ। ইশকুলের পাঠ ভালভাবে না নিয়েও তিনি নিজেকে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী বলে দাবি করতেন। নিজেকে ঘোষণা করেছিলেন পশু ও মৎস্যকুলের প্রভু হিসেবে। ১৯৭০ সালে এক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে আফ্রিকার দেশ উগান্ডার মসনদে আসীন হোন তিনি। দেশের জনগণ তার ক্ষমতারোহনকে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করতে চাইলেও খুব শীঘ্রই এ নেতা হয়ে উঠেন সাক্ষাত অভিশাপ। নাম তার ইদি আমিন দাদা। আফ্রিকান এই স্বৈরশাসকের সালতামামি আজকের আলোচনা।

১৯২৫ সালে উগান্ডায় জন্ম নেয়া ইদি আমিন দাদা শৈশবেই পিতা হারা হোন। উগান্ডা তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভেতরে। মায়ের কাছে পালিত হওয়া ইদি আমিন শৈশবেই এক কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হোন। যার কারণে তার কপালে শিক্ষাদীক্ষা জুটেনি। ঠিকমতো প্রাথমিকের পাঠই শেষ করতে পারেননি তিনি। দিকভ্রান্ত ইদি আমিনের বয়স যত বাড়ে কিছু একটা করার নেশা তত তাকে জেঁকে বসে। ২১ বছর বয়সে যোগ দেন ব্রিটিশদের আফ্রিকান অঞ্চলের সেনাবাহিনী কিংস আফ্রিকান রাইফেলস এ। সোমালিয়া, উগান্ডা, কেনিয়ায় কাজ করার সুবাদে আমিন তার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল কেনিয়ার মাউমাউ বিদ্রোহ দমনে আমিনের সশরীরে অংশগ্রহণ। প্রাকৃতিক ভাবেই আমিন ছিলেন আচরণে নিষ্ঠুর। তাই খুব সহজেই অত্যাচারী ব্রিটিশদের নজর কাড়তে সক্ষম হোন ইদি আমিন। একজন সাধারণ সৈনিক থেকে অফিসার তারপর লেফটেন্যান্ট এর সমান যোগ্যতায় অধিষ্ঠিত হোন তিনি শুধুমাত্র তার বর্বর আচরণবৃত্তির জন্য। ব্রিটিশদের কাছ থেকে উগান্ডা স্বাধীনতা লাভ করলে প্রধানমন্ত্রী ওবোতোর আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে যান ইদি আমিন। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন আমিনের এক সময়ের বন্ধু ওবোতো চাইলেই তাকে কোণঠাসা করে রাখতে পারতেন কিন্তু তিনি তা না করে মূলত এক প্রকার ভয়েই নিজের কাছে টেনে নেন। যার মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল  আমিনের হাতে ক্ষমতা হারানোর মাধ্যমে।  ১৯৭১ সালে ক্যু করার আগে ইদি আমিন প্রথমে মেজর তারপর কর্ণেল এবং মেজর জেনারেল এ পরিণত হোন।

অভ্যূত্থান এর মাধ্যমে উগান্ডার ক্ষমতায় আরোহন করেই আমিন নিজেকে পশু ও মৎস্যকুলের নেতা দাবি করে বলেন,

His Excellency President for Life, Field Marshal Al Hadji Doctor Idi Amin, Lord of All the Beasts of the Earth and Fishes of the Sea, and Conqueror of the British Empire in Africa in General and Uganda in Particular!”

তার ক্ষমতায় আসাকে উগান্ডার সাধারণ জনগণ স্বাভাবিকভাবে নেয়৷ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকেও তিনি খুব একটা বাঁধা পাননি। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই যেন আমিন তার পুরনো চেহারায় ফিরে যেতে লাগলেন। দেশের পুলিশ বাহিনী বিলোপ করে নিজস্ব পদ্ধতির নতুন এক বাহিনী তৈরি করেন যাদের প্রধান কর্তব্য ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওবোতোর সমর্থকদের হত্যা ও নির্যাতন করা। নিষ্ঠুর কায়দায় মানুষ হত্যা আর গুম করে ইদি আমিন ক্রমেই উগান্ডার দুশ্চিন্তায় পরিণত হোন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওবোতো তানজানিয়ায় পালিয়ে গিয়ে তার আনুকুল্যে থাকা সেনাদের নিয়ে একটি অভ্যূত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেন। ওবোতোর সমর্থনে উগান্ডার কিছু অফিসার ছাড়াও তানজানিয়ার আচোলি ও ল্যাঙ্গো সম্প্রদায়ের সামরিক কর্মকর্তারাও যোগ দেন। কিন্তু অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। এরপরই আচোলি ও ল্যাংগো সম্প্রদায়ের সেনাদের উপর নেমে আসে শনির দশা। গণহারে তাদের ছাটাই করতে থাকেন ফলাফল হিসেবে নেমে আসে সেনাদের মধ্যে বর্ণবাদী দাঙ্গা। পুরো উগান্ডায় এই বর্ণবাদী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে ইদি আমিন তার বর্বরতার শেষ দেখান। গড়ে তোলেন নিজস্ব টর্চার সেন্টার। দাঙ্গার সুযোগ নিয়ে হত্যা করেন ওবোতোর ঘনিষ্ঠ সাবেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের। দাঙ্গার  রেশ কাটতে না কাটতেই ইদি আমিন এবার আরেক আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেন। উগান্ডার ব্যবসাখাতে এশিয়ান এবং সামরিক খাতে ইসরায়েলিদের দাপট কমাতে এবং ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য হারের ব্রিটিশদের খেতাতে ইদি আমিন এদের সবাইকে দেশ ছাড়তে নির্দেশ দেন। ফলাফল হিসেবে ব্রিটিশ ও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয় ইদি আমিনের। ইদি আমিনের দুঃশাসনে উগান্ডার অর্থনীতি ধস নামে। সামরিক খাতে খরচ বাড়াতে গিয়ে ইদি আমিন দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে দেন। মুদ্রাস্ফীতি পৌছে চরমে। অকস্মাৎ আমিন তানজানিয়া আক্রমণ করেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের হাতে ১৯৭৮ সালে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা দখল হলে সমাপ্ত হয় ইদি আমিন অধ্যায়৷ পালিয়ে আশ্রয় নেন লিবিয়ায় তারপর ১৯৮৯ সালে সৌদি আরবে গিয়ে ২০০৩ সালের আগস্টে মৃত্যুবরণ করেন। আর এরই সাথে ইতিহাসে ইদি আমিনের অধ্যায় শেষ হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top