ব্যর্থ এক বিপ্লবের ইতিকথা : আরব বসন্ত

মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এই দশকের শুরুর দিকে আন্দোলনে নেমেছিল সাধারণ আরব নাগরিকরা। সাধারণ এই আরবদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে সেখানে পশ্চিমা গোষ্ঠী বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে মাঠে নেমে পড়ে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা আর পশ্চিমা গণমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষকতায় এই আন্দোলন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। দেশে দেশে তাসের ঘরের মত ভেংগে পড়ে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো। পশ্চিমা গণমাধ্যম আরব গণজাগরণের এই নাম দিয়েছিল আরব বসন্ত। কিন্তু আজ এক দশক পরে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায় যেই উদ্দেশ্যে এই গণজাগরণ সংঘটিত হয়েছিল তার কিছু তো বাস্তবায়ন হইনি বরং মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও তার দোসরদের মুক্ত ক্রীড়াঙ্গনই হয়েছে শুধু।

২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ তিউনিসিয়ায় মোহাম্মদ বুয়াজিজি নামের এক তরুণ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে প্রতিবাদস্বরূপ নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। এই ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ তিউনিসিয়ার আপামর জনতা মাঠে নামে। ৪ জানুয়ারি ২০১১ সালে এই আন্দোলন প্রথম সংগঠিত রূপ ধারণ করে। টানা চলা এই আন্দোলন দমাতে তৎকালীন তিউনিসিয়ান বেন আলীর সরকার ব্যাপক দমনপীড়ন চালায়। তার পরেও আন্দোলন বাড়তে থাকলে বেন আলী সরকার বেকায়দায় পড়ে যায়। সাহায্য চায় দেশের সেনাবাহিনীর। কিন্তু সেনাবাহিনী নিজ দেশের জনগণের বুকি গুলি চালাতে অপারগতা প্রকাশ করলে ১৪ জানুয়ারি বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন বেন আলী। পালিয়ে যান সৌদি আরবে। তিউনিসিয়ায় এই বিপ্লবের সফলতার ফলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়৷ মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তখন শাসন করছিল যুগ যুগ ধরে ক্ষমতায় থাকা পরিচিত মুখ রাজনীতিকরা। ফলে জনগণও বিরক্ত হয়ে পড়ছিল তাদের উপর। তিউনিসিয়ার এ সফলতা অপরাপর মুসলিম দেশের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এক মাস পরেই মিশরের জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। সেসময়কার প্রেসিডেন্ট হুসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবিতে ঐতিহাসিক তাহরির স্কয়ারে জড়ো হয় মিশরীয়রা। ৩০ বছর ধরে চলা হুসনি মোবারকের সরকারের বিরুদ্ধে এবার যুগপৎ আন্দোলন গড়ে উঠে। বাধ্য হয়ে ১১ ফেব্রুয়ারিতে হুসনি মোবারক পদত্যাগ করতে বাধ্য হোন। তিউনিসিয়া আর মিশরের জনগণের ধারাবাহিক সফলতা এবার মধ্যপ্রাচ্যের আরেক তেলসমৃদ্ধ দেশ লিবিয়ার ওপর আঘাত হানে। লিবিয়ায় তখন শাসন করছিলেন স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফী। তার ৪২ বছরের শাসনকে স্বৈরাচারী বলা হলেও তার আমলে লিবিয়া একটি শক্তিধর এবং সমৃদ্ধ দেশ ছিল। যাইহোক,পশ্চিমা শক্তিদের পরোক্ষ মদদে এবার লিবিয়াতেও শুরু হয় তথাকথিত আরব বসন্ত নামের এই বিপ্লব। কিন্তু এখানে এসে পশ্চিমারা বিপত্তির মুখে পড়ে। আন্দোলনকে দমাতে গাদ্দাফী সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তার প্রতিরক্ষা বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে দেন। পশ্চিমা গোষ্ঠী এবার লিবিয়ার বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দেয় অস্ত্র। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। রাষ্ট্রীয় ও বিদ্রোহীদের এমন চোর পুলিশ খেলায় পরাজিত হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনী। ২০ অক্টোবর গাদ্দাফী বিদ্রোহীদের হাতে ধৃত ও নিহত হলে আরব বসন্ত আবারো সফলতার মুখ দেখে। লিবিয়ার পর এবার আন্দোলন শুরু হয় সিরিয়ায়। তবে সিরিয়ায় পশ্চিমা গোষ্ঠী এখনো সফল হতে পারেনি। গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সিরিয়া এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ সেখানে প্রক্সিযুদ্ধে লিপ্ত। সাথে জংগী গোষ্ঠীদের অবাধ বিচরণ দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ইয়েমেনে আব্দুল্লাহ সালেহর পতন ঘটে এই আরব বসন্তের কোপানলে পড়ে। অন্যান্য দেশেও আরব বসন্তের ছাট পড়েছিল কিন্তু তেমন সফলতা লাভ করতে পারেনি।

আরব বসন্তে লাভটা কার হল?

২০১১ সালে শুরু হওয়া বিপ্লবের ফলাফল নির্ণয় করতে গেলে হতাশ হয়ে যেতে হয়। যে মহান উদ্দেশ্যে সাধারণ আরবরা রাস্তায় নেমে এসেছিল সেই উদ্দেশ্যকে ভূলুণ্ঠিত করে সেখানে পশ্চিমাদের স্বার্থ হাসিল হয়েছে। নতুন সরকারগুলো পশ্চিমাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে তাদের পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ধ্বংস হচ্ছে তাদের সার্বভৌমত্ব। ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের অর্থনীতি। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর পশ্চিমারা নিজেদের দখলদারিত্ব কায়েম করে রেখেছে। মিশরে আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কর্তৃত্ববাদী আল সিসির শাসন। তিউনিসিয়ায় আজো অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হয়নি। গৃহযুদ্ধে জর্জরিত লিবিয়ায় অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সিরিয়া তো এখন পরিণত হয়েছে সামরিক সরঞ্জামের ভাগাড় হিসেবে। ইয়েমেনে আজ যুদ্ধের তাণ্ডবলীলা। আরব বসন্ত নতুন কিছুই এনে দিতে পারেনি স্বপ্নালু আরবদের। মাঝখান দিয়ে পশ্চিমা আর ইসরায়েলের মত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরা এই পশ্চিম এশিয়া।

লেখকঃ উবায়দুর রাজু

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top