বিশ্বে মাতৃভাষার জন্য প্রথম শহীদ নারী : কমলা ভট্টাচার্য্য

কমলা ভট্টাচার্য্য, বিশ্বের প্রথম নারী শহীদ, যিনি ১৯ মে ১৯৬১ সালে মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতির দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন।

ঘটনাটি বাংলাদেশে নয়, ভারতে। সেই দিনটিতেও কিন্তু ‘বাংলা’কেই সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে শহীদ হয়েছিল ১১ টি তরুণ তরতাজা প্রাণ। তাদের মধ্যেই একজন মাত্র ১৬ বছর বয়েসী এই আলোচিত এবং একমাত্র নারী শহীদ কমলা ভট্টাচার্য্য।

আজ বিশ্বব্যাপী ২১-এ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে, শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয় সকল ভাষা শহীদদের। কিন্তু আসামে বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগকারীরা স্মৃতির দেয়াল হতে হারিয়েই গেছেন।

তবে আজ আমরা জানব বাংলা ভাষার দাবীতে আসামের বরাক উপত্যকায় ১৯৬১ সালের ১৯ মে প্রাণ বিসর্জনকারীদের আন্দোলনটি সম্পর্কে।

১৯৬১ সালে আসামের প্রতিটি অঞ্চলে অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই সময় রাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাঙালি বসবাস করতেন। ফলে, আসাম সরকারের এই একরোখা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রতিবাদ। তাদের দাবী বাংলাকেও সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে আসামে।

প্রতিবাদের সূত্রপাত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়। শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দিসহ বরাক উপত্যকার একাধিক এলাকায় এই দাবিতে একের পর এক আন্দোলন সংগঠিত হতে শুরু করে। সেই আন্দোলনের ঢেউকে প্রতিহত করতে পাল্টা চাপ দিতে শুরু করে তৎকালীন রাজ্য সরকার। সেই সময় প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি আসাম ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। আরও ৯০ হাজার মানুষ, যারা রাজ্য ছাড়তে চাননি তাঁরা বরাক উপত্যকায় গিয়ে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন। আসাম সরকার এতে কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেও কদিন পরেই তাদের ভুল ভেংগে যায়।

পরের বছরই ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শিলচরে গঠিত হলো ‘কাছার গণ সংগ্রাম পরিষদ’। নীলকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন, বিভুতিভূষণ চৌধুরীর নেতৃত্বে শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জে শুরু হল বাংলা ভাষার সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে গণআন্দোলন। সেই বছরই ১৪ এপ্রিল পালন করা হল ‘সংকল্প দিবস’ হিসেবে। ২৪ এপ্রিল থেকে এই দাবিতে বরাক উপত্যকার সর্বত্র শুরু হল ১৫ দিন ব্যপী পদযাত্রা। উদ্দেশ্য ছিলো ওই এলাকার মানুষকে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একত্রিত করা। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা করেন ১৩ই মে’র মধ্যে বাংলা ভাষাকে আসামের সরকারি ভাষার স্বীকৃতি না দেওয়া হলে ১৯ মে হরতাল পালন করা হবে বরাক উপত্যকায়।

কিন্তু আন্দোলনকারীদের হুমকি, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ কিছুতেই কাজ হয়নি। ১৮মে পর্যন্ত বাংলাকে আসামের সরকারি ভাষার স্বীকৃতি না দেয়ায় ১৯ মে সকাল থেকে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুসারে শুরু হলো হরতাল।

শিলচর রেল স্টেশন, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ সহ একাধিক এলাকায় সকাল থেকেই হরতালের সমর্থনে শুরু হয় পিকেটিং। তাঁদের আন্দোলনের জেরে বন্ধ হয় যায় রেল চলাচল। এদিকে, অশান্তির আঁচ করে আগে থেকেই আসাম সরকারের পক্ষ থেকে বরাক উপত্যকাজুড়ে মোতায়েন করা হয় আধাসামরিক বাহিনী। হরতালকে বানচাল করতে ও আন্দোলনকে প্রতিহত করতে বিভিন্ন জায়গায় গ্রেফতার করা হয় আন্দোলনকারীদের। তবুও বিক্ষোভ চলতে থাকে। এক-একটি গ্রেফতারের খবরে জ্বলে উঠতে থাকে আগুন। সময় গড়িয়ে তখন দুপুর আড়াইটা। একটি বেডফোর্ড গাড়িতে কাটিগোড়া থেকে কিছু সত্যাগ্রহীকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছিল। শিলচরের তারাপুর রেল স্টেশনের কাছে পৌঁছতেই আন্দোলনকারীদের একটি দল গিয়ে তাদের ওপর হামলা করে বসে। গাড়ি থেকে পালিয়ে যান পুলিশকর্মীরা। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় গাড়িটিতে। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে প্রথমে লাঠিচার্জ করে আধাসামরিক বাহিনী।তারপর হঠাৎই গুলির শব্দ ! একটি বা দুটি নয়, পর পর ১৭ গরাউন্ড গুলি চালানো হয় বিক্ষোভকারীদের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে স্টেশন চত্বরে লুটিয়ে পড়েন ১৫ জন আন্দোলনকারী। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ৯ জনের। পরের দিন আরও দু’জনের মৃত্যু হয় হাসপাতালে।

এ ঘটনার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ১২ আগস্ট ও ১৯৮১ সালের ২১ জুলাই আরও ৩ জন ব্যক্তি ভাষার জন্য জীবন দান করেন। শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ভাষায় সেদিনের সেই হত্যাকাণ্ডে যারা শহীদ হয়েছেন তাঁরা আর কেউ নন বরং, ‘১০ ভাই চম্পা, আর একটি পারুল বোন, আজকের আলোচিত এই নারী ‘কমলা ভট্টাচার্য’!

শহীদদের তালিকা :
(০১) কানাইলাল নিয়োগী,
(০২) চন্ডীচরণ সূত্রধর,
(০৩) হিতেশ বিশ্বাস,
(০৪) সত্যেন্দ্রকুমার দেব,
(০৫) কুমুদরঞ্জন দাস,
(০৬) সুনীল সরকার,
(০৭) তরণী দেবনাথ,
(০৮) শচীন্দ্র চন্দ্র পাল,
(০৯) বীরেন্দ্র সূত্রধর,
(১০) সুকোমল পুরকায়স্থ এবং
(১১) কমলা ভট্টাচার্য্য।

তাদের সেই আন্দোলন আর আত্মত্যাগ বিফলে যায়নি। পরবর্তী সময়ে বাংলাকে অসমের সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বর্তমানে বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা বাংলাই।

কমলা সম্পর্কে অল্প কিছু লিখছি। কমলা ভট্টাচার্যের জন্ম অবিভক্ত বাংলার সিলেটে ১৯৪৫ সালে। পিতা রামরমন ভট্টাচার্য ও মাতা সুপ্রবাসিনী দেবী। সাত ভাইবোনের মধ্যে কমলা পঞ্চম আর বোনদের মধ্যে তৃতীয়। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের গণহারে হত্যা ও উদ্বাস্তু কার্যক্রম শুরু হলে কমলার পরিবার ভারতের শিলচরে পাড়ি জমায়। উদ্বাস্তু দরিদ্র পরিবারের এ মেয়েটির স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু মেট্রিক পরীক্ষা যেদিন শেষ হয়, তার পরেরদিনই ভাষার আন্দোলনে তার মৃত্যু ঘটে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন করা হয় ২১ ফেব্রুয়ারি। ১৯ মে ১৯৬০ সালের এই দিনটির কথা আমরা ভুলেই গেছি। কেই’বা বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম মহিলা ভাষা শহীদকে মনে রেখেছি?

পরে কমলাসহ ১১ জন শহীদের আবক্ষ মূর্তিসহ একটি ব্রোঞ্জ ফলক রয়েছে শিলচর স্টেশনের এক শহীদ বেদির উপর। ভাষা শহীদদের স্মরণে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনকে ভাষা শহীদ স্টেশন নামকরণ করা হয়।

২০১১ সালে, ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহীদ কমলা ভট্টাচার্য মূর্তি স্থাপন কমিটির পক্ষ থেকে গোপা দত্ত আইচ ছোটেলাল শেঠ ইন্‌ষ্টিটিউটের প্রাঙ্গণে কমলার একটি ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করেন। শিলচরের পাবলিক স্কুলের গা ঘেষে চলে যাওয়া সড়কটির নামকরণ করা হয়ে কমলা ভট্টাচার্য সড়ক, এই রাস্তার পাশেই ভাড়া থাকত কমলার পরিবার।

আর হ্যাঁ, আসামে ১৯ মে এখনও ভাষাদিবস পালন করা হয়।

লেখকঃ বোরহান মাহমুদ

সূত্রঃ
সচলায়তন,
উইকিপিডিয়া,
জনকন্ঠ এবং
জাগরনীয় ডট কম

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top