কুমিল্লার মেয়ে সুনীতি চৌধুরী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের উজ্জ্বল নক্ষত্র

সুনীতি চৌধুরী (ঘোষ ) (২২ মে, ১৯১৭ – ১২ জানুয়ারি, ১৯৮৮) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের নারী বিপ্লবী। তিনি ছিলেন কুমিল্লার নারী বিপ্লবী। নিরীহ-দুঃস্থদের জন্য নানা সেবামূলক কাজ করেছেন।  তিনি ডাক্তার ছিলেন ও মেয়েদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সম্পর্কে জ্ঞানী করে তোলার জন্য সাংগঠনিক কাজ করেছেন। তিনি যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩২ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সাত বছর কারাবন্দী ছিলেন। কারামুক্ত হওয়ার পরেও রাজনৈতিক কাজ করেছেন বিভিন্ন ভাবে।

১৯১৭ সালের ২২শে মে (১ই জ্যৈষ্ঠ) সুনীতি চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন কুমিল্লায়। তার পিতা উমাচরণ চৌধুরী ও মাতা সুরসুন্দরী দেবী। ছোটবেলাতেই কুমিল্লার বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর ও তাঁদের বিপ্লবী জীবনের মর্মন্তুদ কাহিনী তাঁকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর দাদারা ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী।

সুনীতি কুমিল্লার ফৈজন্নেসা গার্লস স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর সহপাঠী ছিলো শান্তি ও প্রফুল্লনলিনী  ব্রহ্ম। প্রফুল্লনলিনী ‘যুগান্তর’নামে বিপ্লবী দলের সভ্য ছিলেন। শান্তি ও সুনীতির তেজস্বিতা প্রফুল্লকে আকৃষ্ট করে।  ধীরে ধীরে সুনীতি স্বদেশী কাজের সাথে যুক্ত হতে থাকেন ও বিপ্লবী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে থাকেন।

১৯৩১ সালে ১৪ই ডিসেম্বর  কুমিল্লা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে গুলি করায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ১৯৩৯ সালে মুক্তির পর শান্তি ও সুনীতি পড়াশুনা করতে থাকেন। দুজনেই ম্যাট্রিক পাস করলেন। তারপর শান্তি পাস করেন আই. এ. ; সুনীতি আই.এস.সি। সুনীতি এম.বি. পাস করে ডাক্তার হন। ডাক্তাররূপে তিনি নীরবে সেবা করে গেছেন দুঃস্থ ও পীড়িত মানবের। ১৯৪৭ সালে সুনীতির বিবাহ হয় চব্বিশ-পরগনার প্রদ্যোতকুমার ঘোষের সঙ্গে।

রাজনৈতিক জীবন

১৯৩০ সালে কুমিল্লায় চলেছিল ‘আইন অমান্য আন্দোলন’। জনতার উপরে ইংরেজের অত্যাচার কুমিল্লার সমস্ত কিশোর ও যুবমনকে প্রচণ্ড একটা ঘা দিয়ে ফিরছিল। তার ঢেউ এসে ধাক্কা দিতে লাগল শান্তি, সুনীতি, প্রফুল্প প্রভৃতিকেও। তাঁদেরও মাথায় ঢুকে গিয়েছিল ইংরেজদের তাড়াতে পারলে তবেই আসবে আমাদের দেশের মঙ্গল।

তাঁরা চমৎকার লাঠি ও ছোরা খেলা শিখে নিলেন। তারপর অভ্যাস করতে লাগলেন রিভলভার চালানোর; এজন্য যেতে হতো ময়নামতী পাহাড়ে। পাড়ায় পাড়ায় লাঠি, ছোরা খেলা শেখাবার ও বিপ্লবাত্মক পুস্তক পড়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা সংগঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

১৯৩১ সালের প্রথমার্ধে কুমিল্লায় ছাত্র-কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে গড়ে তুলেছিলেন ‘ছাত্রীসংঘ’। প্রফুল্পনলিনী ব্রহ্ম তার সভানেত্রী, শান্তি ঘোষ সম্পাদিকা এবং সুনীতি চৌধুরী ক্যাপটেন। ছাত্রীসংঘে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ জন ছাত্রীকে ক্যাপটেন সুনীতি শেখাতেন ড্রিল ও প্যারেড।

ইতিমধ্যে প্রফুল্ল, শান্তি, সুনীতি শুনেছেন বিপ্লবীদের অনুষ্ঠিত গার্লিক হত্যা, সিম্পসন হত্যার ঘটনাবলী। দলের নেতাদের কাছে তারাও কিছু একটা বিপ্লবী কাজ করবার জন্য বারবার তাগিদ দিতে থাকেন।

দলে নেতারা অবশেষে এই সিদ্ধান্ত নেন যে, শান্তি ও সুনীতি কুমিল্লা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে গুলী করে বৃটিশ গভর্নমেন্টকে চরম আঘাত হানবেন।  আরো স্থির হয় যে, শান্তি ও সুনীতি একটা দরখাস্ত দেবার অজুহাতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলোতে গিয়ে কাজ হাসিল করবেন।

মূল অভিযান

১৯৩১ সালে ১৪ই ডিসেম্বর সকালে শান্তি প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন এমন সময় একটা ঘোড়ার গাড়ী এলো দলের দাদাদের নির্দেশমতো। শান্তি গাড়িতে উঠে বসলেন। গাড়ীতে ছিলেন সুনীতি। তাঁদের গাড়ী গিয়ে ঢুকলো জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কুঠিতে। চাপরাসীর হাতে তাঁর ইণ্টারভিউ-কার্ড পাঠিয়ে দিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্স বেরিয়ে এলেন। দায়িত্ব পালনের সুযোগ সমাগত দেখে শান্তি ও সুনীতি গুলি ছুড়লেন। ম্যাজিস্ট্রেটের প্রাণহীন দেহ ভূলুণ্ঠিত হলো। সুনীতিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে দুজন লোকে তাঁকে জাপটে ধরেছে রিভলভারটা কেড়ে নিতে। শান্তিকে পেছন থেকে একজন লোক শক্ত করে ধরে রয়েছে, আরেকজন শান্তির রিভলভার শুদ্ধ হাতটা চেপে ধরেছে। অশ্রাব্য ভাষায় তাঁকে গালাগালি করছে। চাপরাসীরা তাঁদের কিল, চড়, লাথি, ঘুষি মারছে। পুলিশ-লাইনের সামনে পাগলা-ঘটি বেজে উঠল। মুহুর্তের মধ্যে পুলিশ এসে সব ঘিরে ফেলল ; শান্তি-সুনীতির হাত পেছনে বেঁধে দিয়ে তাদের বেদম প্রহার করতে লাগল। এমন সময় ডি.আই.বি. ইন্সপেক্টার এসে প্রহারের হাত থেকে উদ্ধার করে তাঁদের দুজনকে দুই জায়গায় সরিয়ে দেয়। জেরা চলে আলাদা আলাদা ভাবে।

বন্দীজীবন: পুলিশ প্রথমে তাদের নিয়ে যায় কুমিল্লা জেলে। কয়েকদিন পরে শান্তি-সুনীতিকে নিয়ে আসা হয় কলিকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। মামলা শুরু হয় ১৯৩২ সালের ১৮ই জানুয়ারি। মামলার সময় শান্তি ও সুনীতি তাদের হাসি, উচ্ছ্বাস ও তেজস্বীতায় সমস্ত কোর্টকে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন। মামলার দ্বিতীয় দিনে ডকে তাঁদের বসতে চেয়ার দেওয়া হয়নি বলে তারা পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর থেকে শেষদিন পর্যন্ত ডকে তাদের চোয়ার দেওয়া হয়েছিল। অবশেষে ১৯৩২ সালের ২৭শে জানুয়ারি শান্তি-সুনীতি সমগ্র সত্তা কেন্দ্রীভূত করে যখন অপেক্ষা করছিলেন ফাঁসির আদেশ শুনবার জন্য ঠিক তখন তারা দণ্ডাদেশ শুনলেন যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের। অফুরন্তু উৎসাহভরা প্রাণ তাঁদের সেই মুহূর্তে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারা ১৪ ও ১৫ বছরের কিশোরী নাবালিকা এবং স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী; তাই তাদের ফাঁসির আদেশ হয়নি।

এই দুটি কিশোরী মেয়ের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড  ধুমকেতুর মতো সমগ্র দেশকে তোলপাড় করে দিয়ে গোটা সমাজের হয়ে শান্তি বহন করতে কারান্তরালে চলে গেলেন দেশবাসীকে চাঞ্চল্যে ও বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়ে।

শান্তিকে করা হয় দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদী, সুনীতিকে তৃতীয় শ্রেণীর। শান্তি ও সুনীতিকে মাঝে মাঝে একসঙ্গে রাখে কিন্তু অধিকাংশ সময়ই আলাদা আলাদা করে প্রেসিডেন্সি, মেদিনীপুর, রাজশাহী, হিজলী প্রভৃতি জেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্থানান্তরিত করা হত।

যখন তারা মেদিনীপুর জেলে ছিলেন তখন সেখানকার জেলার ও মেট্রনের অনাচারের বিরুদ্ধে শান্তি, সুনীতি ও বীণা দাস অনশন করেছিলেন সাতদিন। ফলে জেলারকে ওখান থেকে বদলি করা হয়। কিন্তু এই বন্দিনীদেরও পৃথক পৃথক জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। শান্তি ও বীণা গেলেন হিজলী জেলে, যেখানে ছিলেন বিনা বিচারে বন্দী রাজবন্দী মহিলাগণ। সুনীতিকে নিয়ে যায় রাজশাহী জেলে। শান্তি সুনীতি যেখানেই যখন গেছেন, তাদের চমৎকার কণ্ঠসঙ্গীতে অন্যসকলকে মাতিয়ে রাখতেন।

পরিবারের উপর পুলিশের নির্যাতন: সুনীতির পরিবারকেকে ধ্বংস করবার উদ্দেশ্যে ইংরেজ গভর্নমেন্ট তাঁদের পরিবারকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে নানা চেষ্ঠা চালায়। সুনীতির বাবার পেনশন বন্ধ করে দিয়। সুনীতির দুই দাদাকে গ্রেপ্তার ও বন্দী করল। তাঁর পিতামাতা ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে উপবাসের মুখে পড়ে গেলেন।

সুনীতির ছোট ভাই আর্থিক সঙ্গতির চেষ্টা করতে গিয়ে অত্যন্ত ক্লিষ্ট জীবন যাপন করবার ফলে যক্ষ্মাতে মৃত্যুবরণ করেন। কারাপ্রাচীরের দুর্ভেদ্য লৌহবর্ষের মধ্যে শান্তি ও সুনীতি কাটিয়ে দিলেন সাতটা শীত ও বসন্ত। অবশেষে গান্ধীজীর প্রচেষ্টায় অন্যসকল রাজনৈতিক বন্দির সঙ্গে তাদেরও মুক্তির আদেশ আসে ১৯৩৯ সালে। মুক্ত হবার পরেও তিনি এক বছর গৃহবন্দী ছিলেন।

সুনীতি চৌধুরী মারা যান ১২ জানুয়ারি, ১৯৮৮ সালে। তিনি সবসময় মানুষের কল্যাণে জীবনকে কাজে লাগিয়েছেন।

তথ্যসুত্র:

* উইকিপিডিয়া, বাংলাপেডিয়া, রোদ্দুরে

লেখক : বোরহান মাহমুদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top